
যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অনেকের কাছে শুধু একটি দেশ নয়—এটি একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা, একটি জীবনযাত্রার নতুন মাত্রা। বিশেষ
করে যারা উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের কাছে আমেরিকা হল লক্ষ্য।
কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ সহজ নয়। আমেরিকায় কাজ করার জন্য শুধু দক্ষতা বা ইচ্ছা থাকলেই হবে না—প্রয়োজন হবে একটি
আইনগত ওয়ার্ক পারমিট ভিসা।
উপস্থাপনা
2026 সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক ভিসা নীতিমালা আগের চেয়ে আরও জটিল এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। নতুন প্রশাসন,
অভিবাসন সংস্কার, এবং অর্থনৈতিক চাহিদা—সব মিলিয়ে ওয়ার্ক ভিসার পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব:
আমেরিকায় ওয়ার্ক পারমিট ভিসা কী, কোন ধরনের ভিসা আছে, 2026 সালে কী পরিবর্তন আসছে, কীভাবে আবেদন করবেন, এবং কী কী
চ্যালেঞ্জ আপনার অপেক্ষায় আছে।
ওয়ার্ক পারমিট ভিসা কী?
যুক্তরাষ্ট্রে “ওয়ার্ক পারমিট” বলতে সাধারণত Employment Authorization Document (EAD) বোঝায়, যা একটি কার্ডের মতো দলিল।
কিন্তু এটি আসলে ভিসা নয়—এটি ইতিমধ্যে আমেরিকায় আইনগত অবস্থানকারী ব্যক্তিদের জন্য কাজের অনুমতি। আর যারা বাইরে থেকে
আমেরিকায় কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রয়োজন হয় ওয়ার্ক ভিসা—যেমন H-1B, L-1, O-1 ইত্যাদি।
এই ভিসাগুলো
আপনাকে আমেরিকায় প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য কাজ করার অধিকার দেয়। এগুলো সাময়িক ভিসা, এবং প্রতিটির নিজস্ব
শর্ত, মেয়াদ ও প্রক্রিয়া আছে। 2026 সালে এই ভিসাগুলোর মধ্যে H-1B সবচেয়ে জনপ্রিয়—বিশেষ করে আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও
ফাইন্যান্স খাতের পেশাজীবীদের কাছে।
2026 সালে আমেরিকার ওয়ার্ক ভিসার ধরন সমূহ
2026 সালে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের জন্য প্রধানত কয়েক ধরনের ভিসা রয়েছে। প্রথম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় হল H-1B ভিসা, যা বিশেষজ্ঞ
পেশাজীবীদের জন্য—যাদের কমপক্ষে ব্যাচেলর ডিগ্রি বা সমতুল্য অভিজ্ঞতা আছে।
এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত 3 বছর, যা আরও 3 বছর
বাড়ানো যায়। দ্বিতীয় হল L-1 ভিসা, যা আন্তর্জাতিক কোম্পানির কর্মকর্তাদের জন্য—যারা একই গ্রুপের আমেরিকান শাখায়
স্থানান্তরিত হচ্ছেন। তৃতীয় হল O-1 ভিসা, যা বিশেষ দক্ষতা বা অসাধারণ কৃতিত্ব প্রমাণিত ব্যক্তিদের জন্য—যেমন গবেষক,
শিল্পী, অ্যাথলিট।
চতুর্থ হল TN ভিসা, যা শুধুমাত্র কানাডা ও মেক্সিকোর নাগরিকদের জন্য—তাই বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য
প্রযোজ্য নয়। এছাড়া, J-1 ভিসা (এক্সচেঞ্জ ভিজিটর) এবং F-1 OPT (শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের অনুমতি) ওয়ার্ক পারমিটের অন্য
দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফর্ম।
H-1B ভিসা
2026 সালে H-1B ভিসার প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন
সার্ভিসেস (USCIS) এখন অনলাইন লটারি সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় 4 লাখ আবেদনের বিপরীতে মাত্র 85,000 ভিসা
বরাদ্দ করা হয়।
এর মধ্যে 20,000 টি শুধুমাত্র আমেরিকার মাস্টার্স বা উচ্চতর ডিগ্রি ধারীদের জন্য। 2026 সালে এই লটারি
প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার জন্য USCIS নতুন অ্যালগরিদম চালু করছে, যাতে একই ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করে সুবিধা নিতে না
পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল—অফশোর কোম্পানিগুলোর জন্য H-1B অনুমোদন কঠোর করা হচ্ছে, যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত
দক্ষতা সম্পন্ন প্রবাসীরা আসতে পারেন। ফলে বাংলাদেশি আইটি প্রফেশনালদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
আবেদনের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা
H-1B ভিসার জন্য প্রথমে আপনাকে একটি আমেরিকান কোম্পানির কাছ থেকে Job Offer Letter পেতে হবে। কোম্পানিটি তারপর Labor
Condition Application (LCA) USCIS-এ জমা দেবে, যেখানে তারা প্রমাণ করবে যে আপনাকে স্থানীয় শ্রমিকদের মতো বেতন দেওয়া
হবে।
LCA অনুমোদনের পর কোম্পানি H-1B পেটিশন (Form I-129) জমা দেবে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ কোম্পানির দায়িত্ব—আপনি
শুধু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (ডিগ্রি, অভিজ্ঞতা সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট) সরবরাহ করবেন।
যোগ্যতার দিক থেকে, আপনার কমপক্ষে একটি
ব্যাচেলর ডিগ্রি বা সমতুল্য 4 বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর আপনার চাকরি অবশ্যই “specialty occupation” হতে হবে—যেমন
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আর্কিটেক্ট ইত্যাদি।
2026 সালে নতুন নীতি ও চ্যালেঞ্জ
2026 সালে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি কিছুটা অনিশ্চিত। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ওয়ার্ক ভিসার ক্ষেত্রে কিছু
পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, সরকার দক্ষ শ্রমিকদের জন্য দরজা খুলে রাখতে চাইছে, কিন্তু অযোগ্য বা
জাল আবেদন রোধ করতে চাইছে।
একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল ভিসা ডেনিয়াল হার বৃদ্ধি—বিশেষ করে যখন কোম্পানির আর্থিক স্থিতি দুর্বল
বা চাকরির বর্ণনা অস্পষ্ট হয়। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল প্রসেসিং টাইম—যা এখন গড়ে 4 থেকে 6 মাস। তবে প্রিমিয়াম প্রসেসিং (15
কর্মদিবসের মধ্যে) অপশন নিলে এটি কমানো যায়, যদিও এর জন্য অতিরিক্ত 2,805 ডলার ফি দিতে হয়।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য H-1B ভিসা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রথমত, আপনার ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতা যেন USCIS-এর মানদণ্ডে
মানানসই হয়। দ্বিতীয়ত, আপনার কোম্পানি যেন রেকর্ড রক্ষণকারী ও বিশ্বস্ত হয়—অফশোর কোম্পানি বা ভার্চুয়াল অফিস এড়িয়ে
চলুন।
তৃতীয়ত, আপনার চাকরির বর্ণনা যেন স্পষ্ট ও পেশাগত হয়—“IT Support” এর চেয়ে “Software Developer in Python and
Machine Learning” বেশি গ্রহণযোগ্য। চতুর্থত, আপনি যদি আমেরিকায় পড়াশোনা করে থাকেন, তাহলে OPT (Optional Practical
Training)-এর মাধ্যমে কাজ শুরু করে H-1B-এ রূপান্তর করা সহজ হয়। শেষোক্ত বিষয় হল—আইনজীবীর সহায়তা নিন। একজন অভিজ্ঞ
ইমিগ্রেশন ল ফার্ম আপনার কেস শক্তিশালী করতে পারে।
উপসংহার
আমেরিকা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা 2026 সালে একটি চ্যালেঞ্জিং কিন্তু সম্ভব লক্ষ্য। এটি শুধু ভাগ্যের উপর নির্ভর করে না—এটি
নির্ভর করে আপনার প্রস্তুতি, যোগ্যতা এবং কৌশলের উপর। যুক্তরাষ্ট্র এখনও দক্ষ মানুষের জন্য দরজা খুলে রেখেছে—শর্ত হল, আপনি
যেন প্রকৃত দক্ষতা নিয়ে আসেন। তাই আপনার ডিগ্রি শক্তিশালী করুন, অভিজ্ঞতা জমা দিন, এবং আইনগত পথ অনুসরণ করুন।