জর্ডান—মধ্যপ্রাচ্যের এই শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে একটি নতুন আশার দেশ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতে কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন যুবতীদের জন্য জর্ডান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। জর্ডানের
গার্মেন্টস শিল্প দ্রুত বর্ধিষ্ণু—আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে জর্ডান-নির্মিত পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।

ফলে দেশটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে দক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক নিয়োগ করছে। কিন্তু এই সুযোগ গ্রহণের আগে জানা অত্যন্ত জরুরি: জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা কিভাবে আবেদন করতে হয়? এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা কী, কীভাবে আবেদন করবেন, কোন কাগজপত্র লাগবে, কত সময় লাগবে, বেতন কত, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা কী?

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা হল এক ধরনের কাজের ভিসা (Work Visa), যা শুধুমাত্র গার্মেন্টস বা টেক্সটাইল খাতে কাজ করার জন্য
প্রদান করা হয়। এই ভিসা জর্ডান সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ফ্যাক্টরি বা এক্সপোর্ট ইউনিটের মাধ্যমে ইস্যু করা হয়। এটি শুধু
মহিলা শ্রমিকদের জন্য নয়—পুরুষ শ্রমিকদের জন্যও এই ভিসা খোলা আছে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিকদের প্রাধান্য দেওয়া
হয়। ভিসাটি সাধারণত 1 বছরের জন্য দেওয়া হয়, যা চুক্তি অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি জর্ডানে আইনগতভাবে
কাজ করতে পারবেন, এবং আপনার অধিকার জর্ডানের শ্রম আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।

আবেদনের প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রথমে আপনাকে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং
এজেন্ট এর মাধ্যমে চাকরির অফার পেতে হবে। এই এজেন্ট জর্ডানের কোনো অনুমোদিত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকবেন।

  কম্বোডিয়া ভিসার দাম কত জেনে নিন

অফার লেটার পাওয়ার পর, আপনাকে প্রবাস কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (BMET)-এ আবেদন করতে হবে। BMET আপনার
পাসপোর্ট, মেডিকেল সার্টিফিকেট, এজেন্টের লাইসেন্স নম্বর এবং চাকরির অফার লেটার যাচাই করে অনুমোদন দেবে।

এরপর জর্ডান পক্ষ থেকে Ministry of Labour আপনার নামে একটি ভিসা অনুমোদন ইস্যু করবে। এই অনুমোদন পেয়ে আপনি পাসপোর্ট অফিসে ভিসা স্ট্যাম্পিং করাবেন। এর আগে আপনাকে একটি মেডিকেল টেস্ট (যক্ষ্মা, HIV, হেপাটাইটিস) পাশ করতে হবে। সফল হলে আপনার পাসপোর্টে জর্ডান ভিসা স্ট্যাম্প হবে।

শেষ ধাপে, আপনি ইমিগ্রেশন চেক পাস করে জর্ডানে প্রবেশ করবেন। জর্ডানে পৌঁছানোর পর আপনাকে Residence Permit
(Iqama) ইস্যু করতে হবে, যা আপনাকে আইনগতভাবে সেখানে থাকার অধিকার দেবে।

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসার জন্য কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা আছে। বয়স সীমা সাধারণত 21 থেকে 35 বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে SSC পাস থাকলে চলে, তবে গার্মেন্টস সেক্টরে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়। আপনার কাছে অবশ্যই একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকতে হবে, যার মেয়াদ কমপক্ষে 2 বছর বাকি থাকতে হবে।প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হল:

  • পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (4×6 সেমি)
  • মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট
  • চাকরির অফার লেটার
  • BMET রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট
  • এজেন্টের লাইসেন্স নম্বর
  • পারিবারিক তথ্য (যদি প্রয়োজন হয়)

সব কাগজপত্র যাচাই হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বেতন ও সুযোগ-সুবিধা

জর্ডানের গার্মেন্টস খাতে বেতন পদ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। একজন সাধারণ অপারেটরের মাসিক বেতন হয় 220 থেকে 280
জর্ডানিয়ান দিনার (JOD), যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় 70,000 থেকে 90,000 টাকা। সুপারভাইজার বা কোয়ালিটি কন্ট্রোলারের বেতন
হতে পারে 350 JOD পর্যন্ত।এছাড়া, জর্ডানের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো সাধারণত নিম্নলিখিত সুবিধা প্রদান করে:

  • ফ্রি আবাসন (মেস বা ডরমেটরি)
  • খাবার (সাধারণত দুই বেলা)
  • চিকিৎসা বীমা
  • বার্ষিক ছুটি (14 থেকে 21 দিন)
  • ফ্লাইট টিকিট (চুক্তি শেষে)
  লিথুনিয়া ওয়ার্ক পারমিট চেক ২০২৫

কিছু ফ্যাক্টরিতে ওভারটাইম বোনাস বা পারফরম্যান্স বোনাস ও দেওয়া হয়, যা মাসিক আয় বাড়ায়।

জর্ডানের শ্রম আইন ও শ্রমিকের অধিকার

জর্ডান শ্রম আইন অনুযায়ী, গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজের সময় হবে সপ্তাহে 48 ঘণ্টা, অর্থাৎ দিনে 8 ঘণ্টা। জোর করে ওভারটাইম
করানো যাবে না। শ্রমিকদের জন্য ঈদ, বার্ষিক ছুটি এবং অসুস্থতার ছুটি আইনত নিশ্চিত করা হয়েছে। যদি কোনো ফ্যাক্টরি এই আইন
ভঙ্গ করে, তাহলে শ্রমিক জর্ডানের Ministry of Labour-এ অভিযোগ করতে পারেন। জর্ডানে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত—বিশেষ করে মহিলা শ্রমিকদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতা

যদিও জর্ডান একটি নিরাপদ দেশ, তবুও কিছু ঝুঁকি আছে। কিছু অসৎ এজেন্ট মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয়—যেমন “বেতন 1 লাখ
টাকা”, “খাবার ফ্রি”, “ছুটি মাসে 4 দিন” ইত্যাদি। এই ধরনের প্রলোভনে কান দেবেন না।

সবসময় BMET-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে
এজেন্টের লাইসেন্স যাচাই করুন।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—“ফ্রি ভিসা” বা “ভিসা ছাড়া কাজ”। জর্ডানে এই ধরনের ভিসা
সম্পূর্ণ অবৈধ। যদি আপনি এই পথে যান, তাহলে জর্ডানে প্রবেশের পর আপনাকে গ্রেফতার করে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তাই শুধুমাত্র আইনগত পথে ভিসা আবেদন করুন।

বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা

জর্ডানে বাংলাদেশের দূতাবাস আম্মানে অবস্থিত। দূতাবাস প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য 24/7 হেল্পলাইন চালু রেখেছে। যদি আপনার কোনো
সমস্যা হয়—যেমন বেতন না পাওয়া, অত্যাচার, বা ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা—তাহলে আপনি দূতাবাসে যোগাযোগ করতে পারেন। দূতাবাস আপনার কাফিলের সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করবে, বা প্রয়োজনে আপনাকে দেশে ফেরত পাঠাবে।

উপসংহার

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি ভালো সুযোগ—বিশেষ করে যারা স্থিতিশীল আয়, নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং আইনগত সুরক্ষা চান। জর্ডান একটি মুসলিম দেশ, তাই সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ বাংলাদেশের মতোই পরিচিত। তবে সুযোগ নেওয়ার আগে নিশ্চিত হোন যে আপনি আইনগত পথে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টের মাধ্যমে, এবং সঠিক তথ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।