ভিয়েতনাম—এশিয়ার এই দ্রুত উন্নতিশীল, শান্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে ক্রমশ একটি আকর্ষণীয়
গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। হ্যানয়, হো চি মিন সিটি, ডানাং—এই শহরগুলো শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বরং কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন
শ্রমিক ও পেশাজীবীদের জন্যও একটি আশার আলো।

ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক্স, গার্মেন্টস, শিপিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও আইটি খাত দ্রুত বর্ধিষ্ণু—ফলে দেশটি নিয়মিত বৈদেশিক শ্রমিক নিয়োগ করছে। কিন্তু এই সুযোগ গ্রহণের আগে জানা অত্যন্ত জরুরি: ভিয়েতনাম কাজের ভিসা কীভাবে পাওয়া যায়? এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: ভিয়েতনামের কাজের ভিসার ধরন, আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতা, বেতন, খরচ, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ভিয়েতনাম কাজের ভিসা কী?

ভিয়েতনামে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় Work Permit এবং Temporary Residence Card (TRC)। Work Permit হল আপনার কাজ করার আইনগত অনুমতি, যা ভিয়েতনামের শ্রম মন্ত্রণালয় (Ministry of Labour, Invalids and Social Affairs) ইস্যু করে। অন্যদিকে, TRC হল আপনার আবাসন পারমিট, যা আপনাকে ভিয়েতনামে আইনগতভাবে থাকার অধিকার দেয়।

এই ভিসা সাধারণত 1 থেকে 2 বছরের জন্য দেওয়া হয়, যা চুক্তি অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। ভিসার ধরন নির্ভর করে আপনার পেশার উপর—যেমন ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, ইঞ্জিনিয়ার, টিচার, আইটি প্রফেশনাল, বা ম্যানেজার। প্রতিটি পেশার জন্য আলাদা যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া প্রযোজ্য।

আবেদন প্রক্রিয়া: কীভাবে ভিসা পাবেন?

ভিয়েতনামের কাজের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে, আপনার ভিয়েতনামি নিয়োগকর্তা আপনার জন্য Work
Permit আবেদন করবেন। এর জন্য তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার মতো দক্ষতা সম্পন্ন স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া যায়নি। এই
প্রক্রিয়ায় সময় লাগে 15 থেকে 20 কর্মদিবস।

  পালাউ কাজের ভিসা ২০২৫

Work Permit অনুমোদিত হলে, আপনি বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় ভিয়েতনামি দূতাবাসে ভিসা আবেদন করবেন। এখানে আপনাকে একটি D-type ভিসা (কাজের ভিসা) ইস্যু করা হবে। এই ভিসা নিয়ে আপনি ভিয়েতনামে প্রবেশ করবেন। ভিয়েতনামে পৌঁছানোর পর, আপনার নিয়োগকর্তা আপনার জন্য Temporary Residence Card (TRC) আবেদন করবেন—যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী থাকার অনুমতি দেবে।সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 4 থেকে 6 সপ্তাহ। তাই যাত্রার অন্তত 2 মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করা উচিত।

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র

ভিয়েতনামে কাজের ভিসার জন্য কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা আছে। প্রথমত, আপনার বয়স হতে হবে 18 থেকে 50 বছর। দ্বিতীয়ত, আপনার কাছে অবশ্যই একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকতে হবে, যার মেয়াদ কমপক্ষে 18 মাস বাকি থাকতে হবে।তৃতীয়ত, আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ফ্যাক্টরি ওয়ার্কারদের জন্য SSC পাস যথেষ্ট, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার বা ম্যানেজারদের জন্য ব্যাচেলর ডিগ্রি বা সমতুল্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হল:

  • পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (4×6 সেমি)
  • মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট
  • চাকরির অফার লেটার
  • শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা অভিজ্ঞতা প্রমাণপত্র
  • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট

সব কাগজপত্র যাচাই হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বেতন ও সুযোগ-সুবিধা

ভিয়েতনামে বেতন খাত ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। একজন সাধারণ ফ্যাক্টরি ওয়ার্কারের মাসিক বেতন হয় 300 থেকে 500 মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় 35,000 থেকে 60,000 টাকা। ইঞ্জিনিয়ার বা আইটি প্রফেশনালদের বেতন হতে পারে 800 থেকে 1,500 ডলার, অর্থাৎ 95,000 থেকে 1,80,000 টাকা।এছাড়া, ভিয়েতনামি কোম্পানিগুলো সাধারণত নিম্নলিখিত সুবিধা প্রদান করে:

  • ফ্রি আবাসন: ফ্যাক্টরি ক্যাম্পাসে ডরমেটরি বা মেস
  • খাবার: দুই বেলা খাবার (কিছু ক্ষেত্রে তিন বেলা)
  • চিকিৎসা বীমা: সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা
  • বার্ষিক ছুটি: 12–15 দিনের বার্ষিক ছুটি
  • ওভারটাইম: সপ্তাহে 48 ঘণ্টার বেশি কাজের জন্য অতিরিক্ত মজুরি
  মালয়েশিয়া সুপার মার্কেট ভিসা সম্পর্কে বিস্তারিত

কিছু কোম্পানি ঈদ বোনাস, অ্যাটেনডেন্স বোনাস, বা পারফরম্যান্স বোনাস ও দেয়—যা মাসিক আয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

খরচ ও এজেন্ট ফি

ভিয়েতনামের কাজের ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথমে, ভিসা আবেদন ফি হল 50 থেকে 100 ডলার, যা প্রায় 6,000 থেকে 12,000 টাকা। এছাড়া, Work Permit ফি হল 100 ডলার, এবং TRC ফি হল 50 ডলার।অন্য খরচের মধ্যে রয়েছে:

  • পাসপোর্ট ও মেডিকেল টেস্ট: 10,000–15,000 টাকা
  • BMET রেজিস্ট্রেশন: 10,000 টাকা
  • ফ্লাইট টিকিট: 40,000–60,000 টাকা

তবে সবচেয়ে বড় খরচ হল এজেন্ট ফি। অনেক এজেন্ট বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে 80,000 থেকে 1,50,000 টাকা নেয়—যদিও এটি আইনত নিষিদ্ধ। ভিয়েতনাম সরকার কোনো শ্রমিককে ভিসা আবেদনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করে না।

সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতা

ভিয়েতনামে কাজের ভিসা পেতে গিয়ে অনেক শ্রমিক প্রতারণার শিকার হন। কিছু অসৎ এজেন্ট “ভিয়েতনাম ভিসা” বলে অন্য দেশের ভিসা (যেমন: কম্বোডিয়া, লাওস) দিয়ে পাঠায়। আবার কেউ কেউ “ফ্রি ভিসা” বা “ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজ” এর প্রস্তাব দেয়—যা সম্পূর্ণ
অবৈধ।গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

  • সবসময় BMET-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্ট ব্যবহার করুন
  • চাকরির অফার লেটারে ভিয়েতনামি কোম্পানির ঠিকানা, ট্যাক্স আইডি ও স্বাক্ষর থাকতে হবে
  • কখনোই ভিসা ছাড়া ভিয়েতনামে যাবেন না—অন্যথায় আপনি অবৈধ প্রবাসী হয়ে যাবেন

উপসংহার

ভিয়েতনাম কাজের ভিসা মানে শুধু কাজ নয়—এটি একটি সুরক্ষিত, সম্মানজনক ও আইনগত প্রবাসী জীবনের সূচনা। বেতন ভালো, অধিকার সুরক্ষিত, এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সফলতা আসে শুধু তখনই, যখন আপনি সঠিক তথ্য, আইনগত পথ এবং সতর্কতা নিয়ে এগিয়ে
যান।