
বিদেশে কাজ, পড়াশোনা বা পরিবারের সাথে থাকার স্বপ্ন দেখা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির কাছে “স্পন্সর ভিসা” শব্দটি প্রায়ই শোনা
যায়। অনেকে মনে করেন এটি এক ধরনের ভিসা, আবার কেউ কেউ ভাবেন এটি কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া। কিন্তু আসলে স্পন্সর ভিসা মানে কী? এটি কি শুধু একটি কাগজ? নাকি এটি আপনার প্রবাসী জীবনের আইনগত ভিত্তি? এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: স্পন্সর ভিসা কী, এটি কেন জরুরি, কীভাবে কাজ করে, কোন দেশে এটি প্রযোজ্য, এবং এটি আপনার অধিকার ও দায়িত্বকে কীভাবে প্রভাবিত করে।
স্পন্সর ভিসা কী?
“স্পন্সর ভিসা” আসলে একটি ভুল প্রচলিত শব্দ। সঠিক ভাষায়, এটি হল “স্পন্সরশিপ-ভিত্তিক ভিসা” বা “স্পন্সর দ্বারা সমর্থিত
ভিসা”। এটি মানে হল—আপনি কোনো বিদেশি দেশে প্রবেশ করছেন এবং সেখানে থাকছেন একজন স্থানীয় নাগরিক বা আইনগত প্রতিষ্ঠানের (যাকে বলা হয় স্পন্সর বা কাফিল) আর্থিক ও আইনগত দায়িত্বে। এই স্পন্সর আপনার ভিসা আবেদন করেন, আপনার খরচ বহন করেন, এবং আপনার আইনগত অবস্থানের জন্য দায়ী থাকেন।এই ব্যবস্থা মূলত মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোতে—যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার,কুয়েত, ওমান, বাহরাইন—এবং কিছু এশীয় দেশে—যেমন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর—প্রচলিত। এই দেশগুলোতে কোনো বৈদেশিক নাগরিক নিজে থেকে ভিসা আবেদন করতে পারেন না; তাঁকে অবশ্যই একজন স্থানীয় স্পন্সরের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।
স্পন্সর বা কাফিল কে?
স্পন্সর হতে পারেন একজন ব্যক্তি (যেমন: আপনার স্বামী, পিতা, ভাই) বা একটি প্রতিষ্ঠান (যেমন: একটি কোম্পানি, হাসপাতাল,
বিশ্ববিদ্যালয়)। মধ্যপ্রাচ্যে এই ব্যক্তিকে সাধারণত “কাফিল” বলা হয়। কাফিল আপনার জন্য ভিসা আবেদন করেন, আপনার আইকামা
(রেজিডেন্স পারমিট) ইস্যু করেন, এবং আপনার দেশ ছাড়ার সময় আপনার ফ্লাইট টিকিট পর্যন্ত দায়িত্ব নেন। আপনি যতদিন সেই দেশে থাকবেন, ততদিন আপনার আইনগত অস্তিত্ব সেই কাফিলের সাথে যুক্ত থাকবে।উদাহরণ হিসেবে, যদি আপনি সৌদি আরবে একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করেন, তাহলে সেই রেস্টুরেন্টের মালিক আপনার কাফিল। আপনি শুধু তাঁর প্রতিষ্ঠানেই কাজ করতে পারবেন—অন্য কোথাও কাজ করলে আপনি আইন ভঙ্গ করবেন। আবার, যদি আপনি UAE-তে আপনার স্বামীর সাথে থাকেন, তাহলে আপনার স্বামী আপনার স্পন্সর—এবং আপনি কোনো চাকরি নিতে চাইলে তাঁর অনুমতি ও নতুন স্পন্সরশিপ লাগবে।
স্পন্সর ভিসা কেন জরুরি?
স্পন্সর ভিসা ব্যবস্থা মূলত দুটি উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে:
প্রথমত, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ—যাতে কোনো বৈদেশিক নাগরিক অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ বা থাকতে না পারে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিক সুরক্ষা—যাতে কোনো শ্রমিক বেকার বা অসহায় হয়ে না যায়।এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করে যে
প্রতিটি প্রবাসীর একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আছে, যিনি তাঁর খরচ, আবাসন ও আইনগত অবস্থার জন্য দায়ী। ফলে,
প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে—অন্তত তত্ত্বে। কিন্তু বাস্তবতায়, এই ব্যবস্থার কিছু ত্রুটিও আছে। কিছু কাফিল
শ্রমিকদের পাসপোর্ট কেড়ে রাখেন, বেতন দেরি করেন, বা কাজের শর্ত পরিবর্তন করেন। এই কারণে অনেক দেশ এখন এই ব্যবস্থায় সংস্কার আনছে—যেমন সৌদি আরবে “কাফালা সংস্কার”, যেখানে শ্রমিক ছাড়ার অনুমতি ছাড়াই চাকরি বদল করতে পারেন।
কোন দেশে স্পন্সর ভিসা প্রযোজ্য?
স্পন্সর ভিসা ব্যবস্থা মূলত নিম্নলিখিত দেশগুলোতে প্রযোজ্য:
- সৌদি আরব: সব কাজের ভিসা, পারিবারিক ভিসা—সবই কাফিলের মাধ্যমে।
- UAE: কাজের ভিসা, ডিপেন্ডেন্ট ভিসা—সবই স্পন্সর ভিত্তিক।
- কাতার: কাজের ভিসা অবশ্যই কাফিলের মাধ্যমে।
- কুয়েত, ওমান, বাহরাইন: একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য।
- মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর: কাজের ভিসা কোম্পানি-ভিত্তিক—অর্থাৎ কোম্পানি হল স্পন্সর।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য—এই দেশগুলোতে স্পন্সর ভিসা বলে কিছু নেই। সেখানে আপনি নিজেই ভিসা
আবেদন করতে পারেন—যদিও কাজের ভিসার জন্য একটি কোম্পানির অফার লেটার লাগে, যা স্পন্সরশিপের মতো কাজ করে, কিন্তু আইনগত দায়িত্ব কম।
স্পন্সর ভিসার সুবিধা ও অসুবিধা
স্পন্সর ভিসার কয়েকটি সুবিধা আছে। প্রথমত, আপনার জন্য একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকেন, যিনি আপনার সমস্যায় সাহায্য করতে
পারেন। দ্বিতীয়ত, আপনার আইনগত অবস্থা সুরক্ষিত থাকে—যতক্ষণ না আপনি চুক্তি ভঙ্গ করেন। তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে স্পন্সর আপনার ফ্লাইট টিকিট, আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু অসুবিধাও আছে। প্রথমত, আপনি স্পন্সরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল—আপনি নিজে থেকে চাকরি বদল করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে স্পন্সর শ্রমিকদের পাসপোর্ট কেড়ে রাখেন—যা আইনত অপরাধ, কিন্তু ঘটে থাকে। তৃতীয়ত, যদি স্পন্সর আপনাকে ছেড়ে দেন, তাহলে আপনি অবৈধ প্রবাসী হয়ে যান।
সতর্কতা ও পরামর্শ
স্পন্সর ভিসায় যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
- সবসময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্ট এর মাধ্যমে যান।
- চাকরির অফার লেটারে বেতন, কাজের সময়, আবাসন, ছুটি—সব কিছু স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে।
- কখনোই আপনার পাসপোর্ট কাউকে দেবেন না—এটি আপনার মূল পরিচয়।
- যদি স্পন্সর আপনার অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে অবিলম্বে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন।
উপসংহার
স্পন্সর ভিসা মানে শুধু একটি ভিসা নয়—এটি আপনার প্রবাসী জীবনের একটি আইনগত চুক্তি। এটি আপনাকে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু আপনাকে সীমাবদ্ধও করে। তাই এই পথে হাঁটার আগে নিশ্চিত হোন যে আপনি সঠিক তথ্য পেয়েছেন, সঠিক স্পন্সরের সাথে যুক্ত হচ্ছেন, এবং আপনার অধিকার সম্পর্কে সচেতন।