ইংল্যান্ড—বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষার্থী গন্তব্য। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন—এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
শুধু শিক্ষার মানের প্রতীক নয়, এগুলো হল ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সুপ্রশস্ত দরজা। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার
শিক্ষার্থী ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখেন।

কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: ইংল্যান্ড স্টুডেন্ট ভিসা খরচ কত? অনেকেই মনে করেন যে শুধু ভিসা
ফি দিলেই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হল—ভিসা খরচ শুধু একটি অংশ। এর সাথে জুড়ে আছে টিউশন ফি, লিভিং কস্ট, হেলথ সার্ভিস চার্জ,
বায়োমেট্রিক্স, ট্রাভেল খরচ—এবং আরও অনেক কিছু। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: ইংল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসার সকল খরচ,
কোথায় কত টাকা লাগবে, কীভাবে খরচ কমানো যায়, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

স্টুডেন্ট ভিসার মূল খরচ: ভিসা আবেদন ফি

ইংল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসা (Student Visa, পূর্বে Tier 4) আবেদনের জন্য প্রধান খরচ হল ভিসা আবেদন ফি। এই ফি নির্ভর করে
আপনি কোথায় আবেদন করছেন তার উপর। বাংলাদেশ থেকে আবেদন করলে ভিসা ফি হয় £490 (প্রায় 73,000 টাকা, 1 GBP ≈ 149 BDT)। এই ফি একবারের জন্য, এবং এটি ইউকে ভিসা ও ইমিগ্রেশন (UKVI) এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অনলাইনে পরিশোধ করতে হয়।

এই ফি শুধু ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য। এটি কোনো গ্যারান্টি দেয় না যে আপনার ভিসা অনুমোদিত হবে। যদি আপনার ভিসা বাতিল হয়,
তাহলে এই ফি ফেরত পাওয়া যায় না। তাই আবেদনের আগে নিশ্চিত হোন যে আপনার সকল ডকুমেন্ট সঠিক ও সম্পূর্ণ।

  চায়না মেডিকেল ভিসা | China medical visa

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—যদি আপনি ইংল্যান্ডে না গিয়ে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস বা উত্তর আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনা করেন,
তাহলেও একই ভিসা ফি প্রযোজ্য—কারণ এগুলো সবই যুক্তরাজ্যের (UK) অংশ।

হেলথ সার্ভিস চার্জ (Immigration Health Surcharge – IHS)

ভিসা ফির পাশাপাশি, ইংল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য অপরিহার্য খরচ হল Immigration Health Surcharge (IHS)। এটি এক ধরনের
স্বাস্থ্য বীমা, যা আপনাকে ইংল্যান্ডে থাকাকালীন জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা (NHS) ব্যবহার করার অধিকার দেয়। এই চার্জ প্রতি
বছরের জন্য £776 (প্রায় 1,15,000 টাকা)।

যদি আপনার কোর্সের মেয়াদ 1 বছর 6 মাস হয়, তাহলে আপনাকে 2 বছরের IHS পরিশোধ করতে হবে—অর্থাৎ £1,552 (প্রায় 2,31,000 টাকা)। এই খরচ ভিসা আবেদনের সময় একসাথে পরিশোধ করতে হয়। IHS ছাড়া আপনি NHS-এর সুবিধা পাবেন না—এমনকি জরুরি চিকিৎসার জন্যও আপনাকে বিল পরিশোধ করতে হবে।

IHS একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খরচ—কারণ ইংল্যান্ডে চিকিৎসা খরচ অত্যন্ত বেশি। একটি সাধারণ হাসপাতাল ভিজিটের খরচ হতে পারে
£100–£300। তাই IHS পরিশোধ করা শুধু আইনগত প্রয়োজন নয়—এটি আপনার আর্থিক সুরক্ষার জন্যও জরুরি।

টিউশন ফি ও লিভিং কস্ট: ভিসা অনুমোদনের শর্ত

ইংল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসা পেতে হলে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কাছে যথেষ্ট অর্থ আছে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর জন্য। এই প্রমাণ ছাড়া আপনার ভিসা অনুমোদিত হবে না।

টিউশন ফি নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সের উপর। সাধারণ ব্যাচেলর কোর্সের জন্য বার্ষিক টিউশন ফি হয় £10,000 থেকে
£25,000 (প্রায় 15 লাখ থেকে 37 লাখ টাকা)। মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি হতে পারে।

লিভিং কস্টের জন্য UKVI একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। যদি আপনি লন্ডনে থাকেন, তাহলে প্রতি মাসে £1,334 (প্রায় 2
লাখ টাকা) প্রমাণ করতে হবে। লন্ডন ছাড়া অন্য শহরের ক্ষেত্রে এটি £1,023 (প্রায় 1.5 লাখ টাকা)। এই অর্থ আপনার ব্যাংক
স্টেটমেন্টে কমপক্ষে 28 দিন ধরে থাকতে হবে।

  নিউজিল্যান্ড ভিসা পাওয়ার উপায় ২০২৫

মোট কথা, ভিসা আবেদনের আগে আপনার ব্যাংকে থাকতে হবে টিউশন ফি + 9 মাসের লিভিং কস্ট—যা সহজেই 40 থেকে 60 লাখ টাকা হতে পারে।

অতিরিক্ত খরচ: বায়োমেট্রিক্স, ট্রাভেল, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন

ভিসা ফি ও IHS ছাড়াও আরও কিছু খরচ আছে। প্রথমে, বায়োমেট্রিক্স অ্যাপয়েন্টমেন্ট—যেখানে আপনার আঙুলের ছাপ ও ছবি নেওয়া
হয়। এটি ঢাকার VFS Global সেন্টারে হয়, এবং এর জন্য আলাদা ফি লাগে না—এটি ভিসা ফির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয়ত, ট্রাভেল খরচ—ফ্লাইট টিকিট। লন্ডনে একটি একমুখী টিকিটের দাম হয় 60,000 থেকে 90,000 টাকা। এটি ভিসা আবেদনের সময় দেখানো লাগে না, কিন্তু যাত্রার আগে বুক করতে হয়।

তৃতীয়ত, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন। আপনার শিক্ষাগত সার্টিফিকেট যদি UK ENIC (পূর্বে UK NARIC) এর মাধ্যমে ভেরিফাই করতে হয়, তাহলে এর জন্য আলাদা ফি লাগে—প্রায় £50–£100। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এটি বাধ্যতামূলক করে।

চতুর্থত, ইংরেজি টেস্ট (IELTS/TOEFL)। এটির ফি হয় 25,000 থেকে 30,000 টাকা। এটি ভিসার জন্য অপরিহার্য—কারণ আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি ইংরেজিতে দক্ষ।

খরচ কমানোর উপায় ও স্কলারশিপ

ইংল্যান্ডে পড়াশোনার খরচ বেশি হলেও, কিছু উপায়ে এটি কমানো যায়। প্রথমত, স্কলারশিপ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি
শিক্ষার্থীদের জন্য আংশিক বা সম্পূর্ণ স্কলারশিপ দেয়। যেমন—Chevening Scholarship, Commonwealth Scholarship, বা
বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক স্কলারশিপ।

দ্বিতীয়ত, লন্ডন ছাড়া অন্য শহরে পড়াশোনা। লন্ডনের লিভিং কস্ট অন্য শহরের তুলনায় 30% বেশি। ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম,
লিডস—এই শহরগুলোতে থাকলে খরচ কমবে।

তৃতীয়ত, পার্ট-টাইম কাজ। ইংল্যান্ডের স্টুডেন্ট ভিসা ধারীরা সেমিস্টারের সময় সপ্তাহে 20 ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে পারেন।
এটি মাসিক 15,000 থেকে 25,000 টাকা আয়ের সুযোগ দেয়—যা লিভিং কস্ট কমাতে সাহায্য করে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

অনেক শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের সময় ভুল করেন। প্রথমত, তারা ব্যাংক স্টেটমেন্টে হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা করেন—যা UKVI সন্দেহ করে। অর্থ অবশ্যই ধীরে ধীরে জমা হতে হবে।

  সৌদি ফ্যামিলি ভিসিট ভিসা করার নিয়ম

দ্বিতীয়ত, তারা ভুয়া অফার লেটার ব্যবহার করেন—যা ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ। শুধুমাত্র UKVI-অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়
(Sponsor License আছে এমন) থেকে অফার লেটার নিন।

তৃতীয়ত, তারা ইংরেজি টেস্ট ছাড়া ভিসা আবেদন করেন—যা সম্ভব নয়। IELTS বা TOEFL স্কোর অবশ্যই প্রয়োজন।

উপসংহার

ইংল্যান্ড স্টুডেন্ট ভিসার মোট খরচ হতে পারে 50 থেকে 70 লাখ টাকা—যাতে ভিসা ফি, IHS, টিউশন ফি, লিভিং কস্ট, ট্রাভেল ও
অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আপনাকে ফিরিয়ে দেবে—উচ্চ মানের শিক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, এবং
গ্লোবাল ক্যারিয়ারের সুযোগের মাধ্যমে।