মালয়েশিয়া—এশিয়ার এই উন্নত, বহুসাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে ক্রমশ একটি
আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। কুয়ালালামপুরের আধুনিক মল, পেনাংয়ের ঐতিহ্যবাহী বাজার, এবং সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা
বিশাল সুপার মার্কেট চেইন—এগুলো শুধু ক্রেতাদের জন্য নয়, বরং কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন যুবক-যুবতীদের জন্যও একটি আশার আলো।

মালয়েশিয়ায় সুপার মার্কেটে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাজের ভিসা। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই
ভিসা কীভাবে পাওয়া যায়, কী যোগ্যতা লাগে, বেতন কত, বা কী কী সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব:
মালয়েশিয়া সুপার মার্কেট ভিসা কী, কীভাবে আবেদন করবেন, বেতন কত, কাজের পরিবেশ কেমন, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

মালয়েশিয়া সুপার মার্কেট ভিসা কী?

মালয়েশিয়ায় সুপার মার্কেটে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় Employment Pass (Category III) বা Work Permit। এটি এক ধরনের
কাজের ভিসা, যা মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (Ministry of Human Resources) কর্তৃক ইস্যু করা হয়। এই ভিসা
শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করার অনুমতি দেয়—যেমন Giant, Tesco, AEON, Mydin, 99 Speedmart ইত্যাদি বড়
সুপার মার্কেট চেইন। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি মালয়েশিয়ায় আইনগতভাবে কাজ করতে পারবেন, এবং আপনার অধিকার মালয়েশিয়ার শ্রম আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।

এই ভিসা সাধারণত 1 থেকে 2 বছরের জন্য দেওয়া হয়, যা চুক্তি অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। ভিসার ধরন নির্ভর করে আপনার পদবীর
উপর—যেমন ক্যাশিয়ার, সেলস অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্টক কিপার, ক্লিনার বা সিকিউরিটি গার্ড। প্রতিটি পদের জন্য আলাদা যোগ্যতা ও
বেতন নির্ধারিত থাকে।

  ঘরে বসে পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে ভিসা চেক করুন ১ মিনিটে

আবেদন প্রক্রিয়া: কীভাবে ভিসা পাবেন?

মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রথমে আপনাকে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত
রিক্রুটিং এজেন্ট এর মাধ্যমে চাকরির অফার পেতে হবে। এই এজেন্ট মালয়েশিয়ার কোনো সুপার মার্কেট চেইনের সাথে চুক্তিবদ্ধ
থাকবেন। অফার লেটার পাওয়ার পর, আপনাকে প্রবাস কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (BMET)-এ আবেদন করতে হবে। BMET আপনার পাসপোর্ট, মেডিকেল সার্টিফিকেট, এজেন্টের লাইসেন্স নম্বর এবং চাকরির অফার লেটার যাচাই করে অনুমোদন দেবে।

এরপর মালয়েশিয়া পক্ষ থেকে Ministry of Human Resources আপনার নামে একটি ভিসা অনুমোদন ইস্যু করবে। এই অনুমোদন পেয়ে আপনি পাসপোর্ট অফিসে ভিসা স্ট্যাম্পিং করাবেন। এর আগে আপনাকে একটি মেডিকেল টেস্ট (যক্ষ্মা, HIV, হেপাটাইটিস) পাশ করতে হবে। সফল হলে আপনার পাসপোর্টে মালয়েশিয়া ভিসা স্ট্যাম্প হবে। শেষ ধাপে, আপনি ইমিগ্রেশন চেক পাস করে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করবেন। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর আপনাকে Residence Permit (Iqama) ইস্যু করতে হবে, যা আপনাকে আইনগতভাবে সেখানে থাকার অধিকারদেবে।

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র

মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেট ভিসার জন্য কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা আছে। বয়স সীমা সাধারণত 21 থেকে 35 বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা
হিসেবে SSC পাস থাকলেই চলে, তবে ইংরেজি বা মালয় ভাষায় মৌখিক দক্ষতা থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়—বিশেষ করে ক্যাশিয়ার বা কাস্টমার সার্ভিস পদের জন্য।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হল:

  • ভ্যালিড পাসপোর্ট (মেয়াদ কমপক্ষে 2 বছর)
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট
  • চাকরির অফার লেটার
  • BMET রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট
  • এজেন্টের লাইসেন্স নম্বর

সব কাগজপত্র যাচাই হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়। মনে রাখবেন, চাকরির অফার লেটারে অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে যে আপনি “Supermarket Staff”, “Cashier”, বা “Sales Assistant” হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন—অন্যথায় ভিসা প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।

বেতন ও সুযোগ-সুবিধা

মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেট শ্রমিকদের মাসিক বেতন হয় 1,800 থেকে 2,500 মালয়েশিয়ান রিংগিত (MYR), যা বাংলাদেশি টাকায়
প্রায় 45,000 থেকে 62,500 টাকা (1 MYR ≈ 25 BDT)। যদি আপনি ক্যাশিয়ার বা সুপারভাইজার হন, তাহলে আপনার বেতন হতে পারে
3,000 MYR পর্যন্ত—যা প্রায় 75,000 টাকা।

  ক্রোয়েশিয়া বেতন কত জেনে নিন ২০২৫

এছাড়া, মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেটগুলো সাধারণত নিম্নলিখিত সুবিধা প্রদান করে:

  • ফ্রি আবাসন: সাধারণত মেস বা ডরমেটরি ব্যবস্থা থাকে।
  • খাবার: দুই বেলা খাবার (সকাল ও রাত) সাধারণত ফ্রি।
  • চিকিৎসা বীমা: সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা বা প্রাইভেট ক্লিনিকে সাবসিডি।
  • বার্ষিক ছুটি: 12–14 দিনের বার্ষিক ছুটি দেওয়া হয়।
  • ওভারটাইম: সপ্তাহে 48 ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত মজুরি দেওয়া হয়।

কিছু বড় চেইনে ঈদ বোনাস, অ্যাটেনডেন্স বোনাস, বা পারফরম্যান্স বোনাস ও দেওয়া হয়—যা মাসিক আয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

কাজের পরিবেশ ও দায়িত্ব

মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেটে কাজের পরিবেশ সাধারণত আধুনিক ও সুসংগঠিত। ক্যাশিয়ারদের দায়িত্ব হল গ্রাহকদের বিল কাটা,
পেমেন্ট গ্রহণ, এবং প্রয়োজনে তথ্য প্রদান। সেলস অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাজ হল পণ্য সাজানো, গ্রাহকদের সাহায্য করা, এবং স্টক
ম্যানেজ করা। স্টক কিপারদের দায়িত্ব হল গুদাম থেকে পণ্য আনা এবং শেলফে সাজানো।

কাজের সময় সাধারণত দিনে 8 ঘণ্টা, তবে ছুটির দিন বা বিশেষ মৌসুমে (যেমন: রমজান, ঈদ, বড়দিন) কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে
মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী, ওভারটাইমের জন্য অতিরিক্ত মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া, সুপার মার্কেটগুলোতে এসি
থাকে, তাই গরমের দেশ হওয়া সত্ত্বেও কাজের পরিবেশ আরামদায়ক।

সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতা

যদিও মালয়েশিয়ার সুপার মার্কেট ভিসা একটি ভালো সুযোগ, তবুও কিছু ঝুঁকি আছে। কিছু অসৎ এজেন্ট “সুপার মার্কেট ভিসা” বলে
অন্য ধরনের ভিসা (যেমন: ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার) দিয়ে পাঠায়। এমন ক্ষেত্রে শ্রমিক সুপার মার্কেটে কাজ না পেয়ে অন্য কঠিন
কাজে যুক্ত হয়।

আরেকটি ঝুঁকি হল—“ফ্রি ভিসা”। কিছু এজেন্ট বলে, “ভিসা আছে, কাজ খুঁজে নেবেন সেখানে গিয়ে।” কিন্তু এটি সম্পূর্ণ অবৈধ।
মালয়েশিয়া সরকার এই ভিসা নিষিদ্ধ করেছে। যে কোনো প্রবাসী যদি এই ভিসায় প্রবেশ করে, তাহলে তিনি আইনত অবৈধ প্রবাসী হিসেবে গণ্য হবেন এবং যেকোনো সময় গ্রেফতার হয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে পারেন।

  বাংলাদেশ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত সময় লাগে

তাই সবসময় BMET-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এজেন্টের লাইসেন্স যাচাই করুন এবং চাকরির অফার লেটারে “Supermarket”, “Cashier”, বা “Retail Staff” স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

উপসংহার

মালয়েশিয়া সুপার মার্কেট ভিসা শুধু একটি চাকরির সুযোগ নয়—এটি একটি আধুনিক কাজের পরিবেশ, নিরাপদ জীবনযাত্রা এবং
স্থিতিশীল আয়ের পথ। এই কাজের মাধ্যমে আপনি শুধু আয় করবেন না, বরং আন্তর্জাতিক কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন—যা ভবিষ্যতে
আপনার ক্যারিয়ারে সাহায্য করবে। তবে এই পথে হাঁটার আগে নিশ্চিত হোন যে আপনি আইনগত পথে, সঠিক এজেন্টের মাধ্যমে, এবং স্পষ্ট চুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।