সিঙ্গাপুর—এশিয়ার এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত উন্নত দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। উচ্চ বেতন, নিরাপদ
পরিবেশ, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং আইনগত সুরক্ষা—সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুর অনেকের কাছে স্বপ্নের দেশ। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত
করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসা কত টাকা? অনেকেই মনে করেন যে সিঙ্গাপুরে কাজের ভিসা পেতে লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বাস্তবতা একটু আলাদা।

সিঙ্গাপুর সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে কোনো শ্রমিককে ভিসা আবেদনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে না। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসার প্রকারভেদ, প্রতিটি ভিসার খরচ (টাকায়), কোন খরচ কার উপর, এজেন্ট ফি কত হতে পারে, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসার ধরন

সিঙ্গাপুরে কাজের জন্য মূলত তিন ধরনের ভিসা আছে: Work Permit, S Pass, এবং Employment Pass (EP)। প্রতিটি ভিসার নিজস্ব
যোগ্যতা, বেতন সীমা এবং খরচ আছে।Work Permit হল সবচেয়ে সাধারণ ভিসা—যা মূলত শ্রমিক, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, মেয়েদের জন্য ডমেস্টিক ওয়ার্কার (FDW) এবং ম্যানুফ্যাকচারিং শ্রমিকদের জন্য। এই ভিসার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কম গুরুত্বপূর্ণ—বেশি
গুরুত্ব দেওয়া হয় কাজের অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতার উপর।

S Pass হল মধ্যম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য—যেমন টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার, বা জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। এই ভিসার জন্য কমপক্ষে Diploma বা সমতুল্য যোগ্যতা এবং মাসিক বেতন 3,000 সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি হতে হয়। Employment Pass (EP) হল উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের জন্য—যেমন ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি প্রফেশনাল। এই ভিসার জন্য মাসিক বেতন অবশ্যই 5,600 সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি হতে হয়, এবং ব্যাচেলর ডিগ্রি থাকতে হয়।

ভিসা ফি: সরকারি খরচ কত?

সিঙ্গাপুর সরকার কাজের ভিসার জন্য একটি স্পষ্ট ফি স্ট্রাকচার নির্ধারণ করেছে। এই ফি গুলো সবসময় সিঙ্গাপুর ডলারে (SGD) হিসাব
করা হয়।Work Permit-এর জন্য সরকারি ফি হল:

  • আবেদন ফি: 35 SGD
  • ইস্যু ফি: 35 SGD
  • মেডিকেল টেস্ট ফি: 50 SGD
  • সিকিউরিটি বন্ড (কাফিল কর্তৃক প্রদেয়): 5,000 SGD (শ্রমিকের উপর নয়)
  ক্রোয়েশিয়া ভিসা দাম কত জেনে নিন

S Pass-এর জন্য:

  • আবেদন ফি: 75 SGD
  • ইস্যু ফি: 100 SGD

Employment Pass-এর জন্য:

  • আবেদন ফি: 105 SGD
  • ইস্যু ফি: 225 SGD

বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে (1 SGD ≈ 85 BDT ধরে):

  • Work Permit-এর মোট সরকারি খরচ ≈ 9,350 টাকা
  • S Pass ≈ 14,875 টাকা
  • Employment Pass ≈ 28,050 টাকা

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই সরকারি ফি গুলো কাফিল (নিয়োগকর্তা) পরিশোধ করবেন, শ্রমিক নয়। সিঙ্গাপুর আইন অনুযায়ী, কোনো
শ্রমিককে ভিসা ফি দিতে বাধ্য করা যাবে না।

এজেন্ট ফি ও অন্যান্য খরচ

যদিও সরকারি ফি কাফিলের দায়িত্ব, তবুও বাংলাদেশে অনেক শ্রমিককে রিক্রুটিং এজেন্টের কাছে টাকা দিতে হয়। এই ফি আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু বাস্তবতায় এটি প্রচলিত। এজেন্ট ফি প্রতি ব্যক্তির জন্য 50,000 থেকে 1,50,000 টাকা পর্যন্ত হতে পারে—যা ভিসার ধরন,
চাকরির পদ এবং এজেন্টের নীতির উপর নির্ভর করে।এছাড়া, আরও কিছু খরচ হতে পারে:

  • পাসপোর্ট তৈরি/রিনিউ: 5,000–7,000 টাকা
  • মেডিকেল টেস্ট (বাংলাদেশে): 3,000–5,000 টাকা
  • BMET রেজিস্ট্রেশন: 10,000 টাকা
  • ফ্লাইট টিকিট: 40,000–60,000 টাকা (যা কাফিল দিতে পারেন)

মোট খরচ যদি এজেন্ট ফি সহ হয়, তাহলে একজন শ্রমিকের জন্য 1 লাখ থেকে 2 লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন—এই খরচের বেশিরভাগ অংশ এজেন্ট ফি, যা আইনত প্রয়োজন নেই।

কার উপর কোন খরচ?

সিঙ্গাপুর সরকার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে:

  • ভিসা আবেদন ও ইস্যু ফি → কাফিলের দায়িত্ব
  • মেডিকেল টেস্ট (সিঙ্গাপুরে) → কাফিলের দায়িত্ব
  • ফ্লাইট টিকিট → কাফিল দিতে পারেন (চুক্তি অনুযায়ী)
  • Work Permit সিকিউরিটি বন্ড → কাফিল জমা দেবেন

শ্রমিকের উপর শুধু নিম্নলিখিত খরচ থাকতে পারে:

  • পাসপোর্ট তৈরি
  • BMET রেজিস্ট্রেশন
  • বাংলাদেশে মেডিকেল টেস্ট

যদি কোনো এজেন্ট বা কাফিল শ্রমিকের কাছে ভিসা ফি চায়, তাহলে তা আইনত অপরাধ।

সতর্কতা ও পরামর্শ

অনেক শ্রমিক সিঙ্গাপুরে কাজের ভিসা পেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। কিছু এজেন্ট “Work Permit” এর পরিবর্তে “Tourist Visa”
দিয়ে পাঠায়—যা কাজ করার অনুমতি দেয় না। এমন ক্ষেত্রে শ্রমিক সিঙ্গাপুরে গিয়ে অবৈধ প্রবাসী হয়ে যায় এবং গ্রেফতার হয়ে
দেশে ফেরত আসে।আরেকটি সাধারণ প্রতারণা হল—“ভিসা পেয়েছি, এখন টাকা দাও”। কিন্তু সিঙ্গাপুরে ভিসা শুধু কাফিল আবেদন করলেই হয়—শ্রমিকের কোনো ভূমিকা নেই। তাই কখনোই ভিসা ছাড়া টাকা দেবেন না।সবসময় BMET-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্ট ব্যবহার করুন। এজেন্টের লাইসেন্স নম্বর https://bmet.gov.bd ওয়েবসাইটে যাচাই করুন।

  ফিলিপাইন ভিসা করুন ফ্লাইওয়ে ট্রাভেলে

উপসংহার

সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসার সরকারি খরচ তুলনামূলকভাবে কম—মাত্র 9,000 থেকে 28,000 টাকা। কিন্তু এজেন্ট ফি ও অন্যান্য খরচ
মিলিয়ে মোট খরচ বেড়ে যায়। তবুও, সিঙ্গাপুরের উচ্চ বেতন (Work Permit ধারীদের জন্য মাসিক 25,000–40,000 টাকা) এই খরচ কয়েক মাসের মধ্যে কভার করে দেয়।