তালি—ইউরোপের এই ঐতিহ্যবাহী, সুন্দর ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।
রোমের কলোসিয়াম, ভেনিসের নৌপথ, ফ্লোরেন্সের শিল্প—এগুলো শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বরং কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন
যুবক-যুবতীদের কাছেও একটি স্বপ্ন। কিন্তু ইতালিতে কাজ করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: ইতালি স্পন্সর ভিসা বেতন কত? অনেকেই মনে করেন যে ইতালিতে কাজ করলে মাসিক 1 লাখ টাকা আয় হয়।

কিন্তু বাস্তবতা একটু আলাদা। ইতালিতে “স্পন্সর ভিসা” বলে কোনো আনুষ্ঠানিক ভিসা নেই—বরং কাজের ভিসা একটি নিয়োগকর্তা-ভিত্তিক প্রক্রিয়া, যেখানে একটি ইতালিয়ান কোম্পানি বা ব্যক্তি আপনার জন্য ভিসা আবেদন করেন। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: ইতালিতে কাজের ভিসা কীভাবে কাজ করে, বেতন কত, কোন খাতে কত আয় হয়, কী কী খরচ লাগে, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ইতালিতে “স্পন্সর ভিসা” মানে কী?

ইতালিতে আসলে “স্পন্সর ভিসা” বলে কোনো আলাদা ভিসা নেই। এটি একটি ভুল প্রচলিত ধারণা। ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ, তাই এখানে ভিসা প্রক্রিয়া ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসরণ করে। ইতালিতে কাজ করার জন্য আপনার প্রয়োজন হবে “Nulla Osta al Lavoro”—একটি কাজের অনুমোদন, যা ইতালিয়ান কোম্পানি বা নিয়োগকর্তা ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

এই অনুমোদন পাওয়ার পর আপনি বাংলাদেশের ইতালিয়ান দূতাবাসে ভিসা আবেদন করতে পারেন।এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকর্তা আপনার “স্পন্সর” হিসেবে কাজ করেন—কিন্তু তাঁর কোনো আইনগত দায়িত্ব নেই আপনার খরচ বহন করার। এটি মধ্যপ্রাচ্যের “কাফালা” ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইতালিতে আপনি চাকরি বদল করতে পারেন, নিজের পাসপোর্ট রাখতে পারেন, এবং আইনগত অধিকার পান।

ইতালিতে কাজের ভিসার ধরন

ইতালিতে মূলত দুই ধরনের কাজের ভিসা আছে:

  1. Subordinate Work Visa (D-type): এটি নিয়মিত চাকরির জন্য—যেমন ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, কুক, ওয়েটার, ক্লিনার।
  1. Self-Employed Visa: এটি ব্যবসায়ী বা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য—যেমন টেইলর, ফটোগ্রাফার, কনসালট্যান্ট।
  দুবাই ভিসা দাম কত জেনে নিন

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে সাধারণ হল Subordinate Work Visa। এই ভিসার জন্য আপনার কাছে একটি ইতালিয়ান কোম্পানির চাকরির অফার লেটার লাগবে, যেখানে বেতন, কাজের ধরন ও মেয়াদ উল্লেখ থাকবে।

ইতালিতে কাজের ভিসার ধরন

ইতালিতে কাজের জন্য মূলত দুটি ধরনের ভিসা প্রচলিত: Subordinate Work Visa (D-type) এবং Self-Employed Visa। Subordinate Work Visa হল সেই ভিসা যা একজন ইতালিয়ান নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি আপনার জন্য আবেদন করেন। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে নিয়মিত চাকরি করতে পারবেন।

এটি ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, রেস্টুরেন্ট স্টাফ, কৃষি শ্রমিক, ডমেস্টিক ওয়ার্কার বা কেয়ারগিভারদের জন্য প্রযোজ্য। এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত 1 বছর, যা চুক্তি অনুযায়ী রিনিউ করা যায়।অন্যদিকে, Self-Employed Visa হল সেই ভিসা যা নিজের ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্স কাজের জন্য প্রযোজ্য। এই ভিসার জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কাছে যথেষ্ট আর্থিক স্থিতি আছে, এবং আপনি ইতালিতে একটি বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।

এই ভিসা টেইলর, ফটোগ্রাফার, কনসালট্যান্ট বা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য উপযুক্ত। তবে এই ভিসা পেতে জটিল প্রক্রিয়া এবং উচ্চ আর্থিক প্রমাণ প্রয়োজন হয়, তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে এটি কম জনপ্রিয়।এছাড়া, ইতালি প্রতি বছর Seasonal Work Visa ও ইস্যু করে—যা মূলত কৃষি খাতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের জন্য। এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত 6 মাস, এবং এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মৌসুমে কাজ করার অনুমতি দেয়। এই ভিসার জন্য আবেদন সাধারণত ইতালিয়ান কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়, এবং এটি বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট দেশগুলোর জন্য খোলা থাকে।

বেতন: কত টাকা আয় হয়?

ইতালিতে বেতন খাত, অভিজ্ঞতা, অঞ্চল এবং চুক্তির ধরনের উপর নির্ভর করে। ইতালি সরকার কোনো সার্বজনীন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেনি, বরং প্রতিটি শিল্প খাতের জন্য আলাদা Collective Labour Agreement (CCNL) রয়েছে, যা বেতন, কাজের সময় ও ছুটির নিয়ম নির্ধারণ করে।ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে, মাসিক বেতন সাধারণত 1,200 থেকে 1,600 ইউরো হয়। এটি বাংলাদেশি টাকায় প্রায় 1,45,000 থেকে 1,95,000 টাকা (1 EUR ≈ 121 BDT)।

  বাংলাদেশ থেকে কম খরচে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়

যদি আপনি অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান বা মেশিন অপারেটর হন, তাহলে আপনার বেতন হতে পারে 1,800 ইউরো পর্যন্ত।রেস্টুরেন্ট খাতে কাজ করলে মাসিক বেতন হয় 1,000 থেকে 1,400 ইউরো, অর্থাৎ 1,21,000 থেকে 1,70,000 টাকা। তবে ইতালিতে টিপস প্রথা কম, তাই আয় শুধু বেতনের উপর নির্ভর করে। কৃষি শ্রমিকদের জন্য মাসিক বেতন হয় 900 থেকে 1,200 ইউরো, যা প্রায় 1,09,000 থেকে 1,45,000 টাকা। ডমেস্টিক ওয়ার্কার বা কেয়ারগিভারদের বেতন সাধারণত 850 থেকে 1,100 ইউরো, অর্থাৎ 1,03,000 থেকে 1,33,000 টাকা।

এছাড়া, ইতালিতে ওভারটাইম দেওয়া হয়—যা সাধারণত ঘণ্টায় 10 থেকে 15 ইউরো। গড়ে, একজন শ্রমিক মাসে 200 থেকে 400 ইউরো ওভারটাইম আয় করতে পারেন, যা মাসিক আয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সুযোগ-সুবিধা

ইতালিতে কাজের ভিসা ধারীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, আপনি সরকারি স্বাস্থ্য বীমা পাবেন, যার
মাধ্যমে আপনি সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা পাবেন। দ্বিতীয়ত, আপনি বার্ষিক 20 থেকে 25 দিনের ছুটি পাবেন—যা ইউরোপীয়
মানদণ্ড অনুযায়ী। তৃতীয়ত, আপনি পেনশন সুবিধা পাবেন—যদি আপনি দীর্ঘমেয়াদে ইতালিতে কাজ করেন।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল Family Reunification।

আপনি যদি ইতালিতে 1 বছর আইনগতভাবে থাকেন, তাহলে আপনি আপনার স্ত্রী/স্বামী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য পরিবার পুনর্মিলন ভিসা আবেদন করতে পারেন। এই ভিসার মাধ্যমে আপনার পরিবারও ইতালিতে থাকতে পারবেন এবং আপনার সন্তানরা সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করতে পারবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—আবাসন ও খাবার সাধারণত নিজের খরচে ব্যবস্থা করতে হয়। ইতালিতে ভাড়া বেশ বেশি—বিশেষ করে মিলান, রোম বা ফ্লোরেন্সে। গড়ে, একজন শ্রমিক মাসিক 400 থেকে 600 ইউরো আবাসন ও খাবারে খরচ করেন। তবে কিছু কোম্পানি ফ্যাক্টরি ক্যাম্পাসে ফ্রি বা সাবসিডাইজড আবাসন দেয়—যা খরচ কমাতে সাহায্য করে।

খরচ ও আবেদন প্রক্রিয়া

ইতালির কাজের ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথমে, ভিসা আবেদন ফি হল 116 ইউরো, যা প্রায় 14,000 টাকা। এছাড়া, আপনাকে পাসপোর্ট তৈরি বা রিনিউ, মেডিকেল টেস্ট, এবং BMET রেজিস্ট্রেশন করতে হবে—যা মোট 25,000 থেকে 30,000 টাকা খরচ করে।অন্য একটি বড় খরচ হল এজেন্ট ফি।

  তুরস্ক ভিসার দাম কত জেনে নিন

অনেক এজেন্ট বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে 1 লাখ থেকে 2 লাখ টাকা নেয়—যদিও
এটি আইনত নিষিদ্ধ। ইতালি সরকার কোনো শ্রমিককে ভিসা আবেদনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করে না। তবুও, বাস্তবতায় এই খরচপ্রচলিত।আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় একটি ইতালিয়ান কোম্পানির চাকরির অফার লেটার দিয়ে।

কোম্পানি ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ে Nulla Osta al Lavoro আবেদন করেন। এই অনুমোদন পাওয়ার পর, আপনি ঢাকার ইতালিয়ান দূতাবাসে ভিসা ইন্টারভিউয়ের জন্য আবেদন করবেন। ইন্টারভিউতে আপনাকে চাকরি, বেতন ও ইতালি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সফল হলে আপনার পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প হবে।পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 2 থেকে 4 মাস। তাই আবেদন শুরু করার আগে পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করুন।

উপসংহার

ইতালিতে কাজের ভিসা মানে শুধু কাজ নয়—এটি একটি সুরক্ষিত, সম্মানজনক ও আইনগত প্রবাসী জীবনের সূচনা। বেতন ভালো, অধিকার সুরক্ষিত, এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সফলতা আসে শুধু তখনই, যখন আপনি সঠিক তথ্য, আইনগত পথ এবং সতর্কতা নিয়ে এগিয়ে যান। ইতালির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক—আপনার প্রস্তুতি ও জ্ঞানের মাধ্যমে।