
আলবেনিয়া—ইউরোপের এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর দেশটি বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে এখনো অপেক্ষাকৃত অজানা। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। আড্রিয়াটিক সমুদ্রের তীরে অবস্থিত এই দেশে আছে প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপত্য, নীল জলের সমুদ্র সৈকত, পাহাড়ি দৃশ্য, এবং এক অনন্য সংস্কৃতি। তিরানা, বারি, সারান্দা—এই শহরগুলো পর্যটকদের কাছে ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু আলবেনিয়ায় প্রবেশের আগে জানা অত্যন্ত জরুরি: আলবেনিয়া টুরিস্ট ভিসা কীভাবে পাওয়া যায়?
কী কাগজপত্র লাগে, কত খরচ হয়, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে—এই সব প্রশ্নের উত্তর এই নিবন্ধে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।
আলবেনিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রয়োজন কি না?
হ্যাঁ, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আলবেনিয়ায় প্রবেশের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা বাধ্যতামূলক। আলবেনিয়া যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের
(EU) সদস্য নয়, তবুও এটি সেঞ্জেন অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত। ফলে, আলবেনিয়া স্বাধীনভাবে ভিসা নীতি নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ
আলবেনিয়ার “ভিসা-প্রয়োজনীয়” দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, আপনি যদি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ধারী হন, তাহলে
আলবেনিয়ায় প্রবেশের আগে অবশ্যই একটি ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন করতে হবে।এই ভিসা ছাড়া আপনি আলবেনিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন না। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার ভিসা চেক করবেন, এবং যদি ভিসা না থাকে, তাহলে আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তাই যাত্রার আগে ভিসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আলবেনিয়া ট্যুরিস্ট ভিসার ধরন ও মেয়াদ
আলবেনিয়া মূলত দুই ধরনের ট্যুরিস্ট ভিসা ইস্যু করে: সিঙ্গেল এন্ট্রি এবং মাল্টিপল এন্ট্রি। সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা দিয়ে আপনি
আলবেনিয়ায় একবার প্রবেশ করতে পারবেন, এবং সাধারণত 30 দিন পর্যন্ত থাকতে পারবেন। অন্যদিকে, মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দিয়ে
আপনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিকবার আলবেনিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন—যেমন 90 দিনের মধ্যে 30 দিন থাকার অনুমতি।
ভিসার মেয়াদ আপনার যাত্রার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা এবং আবেদনে দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে। সাধারণ পর্যটকদের জন্য 30 দিনের সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসাই সবচেয়ে সাধারণ। যদি আপনি আলবেনিয়ার পাশাপাশি মন্টিনিগ্রো, গ্রিস বা কসোভো ঘুরার পরিকল্পনা করেন, তাহলে মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা আবেদন করা যেতে পারে।
ভিসা আবেদনের প্রক্রিয়া
আলবেনিয়ার ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল। অর্থাৎ, এটি অনলাইনে আবেদন করা যায় না। আপনাকে অবশ্যই
ঢাকায় অবস্থিত আলবেনিয়ান দূতাবাসে বা তাদের অনুমোদিত ভিসা সেন্টারে প্রত্যক্ষভাবে আবেদন করতে হবে। প্রথমে আপনাকে দূতাবাসের ওয়েবসাইট বা ফোনে যোগাযোগ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। তারপর নির্দিষ্ট দিনে আপনাকে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দূতাবাসে উপস্থিত হতে হবে।দূতাবাসে আপনার কাগজপত্র যাচাই করা হবে, এবং আপনাকে একটি আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউতে অংশ নিতে হতে পারে—যেখানে আপনার যাত্রার উদ্দেশ্য, থাকার স্থান, এবং ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সফল হলে আপনার পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প করা হবে।পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 5 থেকে 10 কর্মদিবস। তাই যাত্রার অন্তত 3 সপ্তাহ আগে আবেদন শুরু করা উচিত।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আলবেনিয়া ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কাগজপত্র প্রয়োজন। প্রথমত, আপনার কাছে একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকতে হবে,
যার মেয়াদ যাত্রার শেষ তারিখের পরেও কমপক্ষে 6 মাস বাকি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আপনার দুটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগবে—যা
সাম্প্রতিক এবং সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের হতে হবে।
তৃতীয়ত, আপনাকে একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা (Itinerary) জমা দিতে হবে—যেখানে আপনার আগমন ও প্রস্থানের তারিখ, থাকার ঠিকানা, এবং ঘোরার পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে। চতুর্থত, আপনাকে হোটেল বুকিং কনফার্মেশন দিতে হবে—যা আলবেনিয়ার কোনো অনুমোদিত হোটেল থেকে নেওয়া হতে হবে।পঞ্চমত, আপনাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আর্থিক প্রমাণ দিতে হবে—যেখানে দেখানো হবে যে আপনার কাছে যাত্রার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে। সাধারণত প্রতি দিনের জন্য 50 ইউরো হিসাবে প্রমাণ করতে হয়। ষষ্ঠত, আপনাকে ফ্লাইট টিকিটের কনফার্মেশন দিতে হবে—যেখানে আগমন ও প্রস্থান উভয় তারিখ উল্লেখ থাকবে।
ভিসা ফি ও অন্যান্য খরচ
আলবেনিয়া ট্যুরিস্ট ভিসার ফি হল 30 ইউরো (প্রায় 4,500 টাকা)। এই ফি নগদে বা ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করা যায়। এছাড়া, যদি
আপনি ভিসা প্রসেসিং ত্বরান্বিত করতে চান (Express Service), তাহলে অতিরিক্ত 20 ইউরো ফি দিতে হবে।অন্যান্য খরচের মধ্যে
রয়েছে:
- ফ্লাইট টিকিট: ঢাকা থেকে তিরানা যাওয়ার জন্য রাউন্ড ট্রিপ টিকিটের দাম হয় 80,000 থেকে 1,20,000 টাকা।
- হোটেল বুকিং: গড়ে প্রতি রাতে 3,000 থেকে 6,000 টাকা।
- খাবার ও পরিবহন: দৈনিক খরচ হয় 2,000 থেকে 4,000 টাকা।
মোট কথা, একজন বাংলাদেশি পর্যটকের জন্য 7 দিনের আলবেনিয়া সফরের মোট খরচ হতে পারে 1.5 থেকে 2.5 লাখ টাকা।
সতর্কতা ও পরামর্শ
আলবেনিয়া ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদনের সময় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। প্রথমত, কখনোই ভুয়া হোটেল বুকিং বা ফ্লাইট টিকিট
ব্যবহার করবেন না—কারণ দূতাবাস এই তথ্য যাচাই করে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক স্টেটমেন্টে হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা করবেন না—অর্থ ধীরে ধীরে জমা হওয়া উচিত।তৃতীয়ত, আপনার যাত্রার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতে হবে। যদি আপনি বলেন যে আপনি শুধু “ঘুরবেন”, তাহলে ভিসা বাতিল হতে পারে। বরং বলুন যে আপনি “ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে যাচ্ছেন” বা “সমুদ্র সৈকতে ছুটি কাটাবেন”।চতুর্থত, আলবেনিয়ায় প্রবেশের পর আপনার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশ ছেড়ে আসতে হবে। অন্যথায় আপনি জরিমানা বা ভবিষ্যতে ভিসা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারেন।
উপসংহার
আলবেনিয়া ট্যুরিস্ট ভিসা পাওয়া জটিল নয়—শর্ত হল আপনি যেন সঠিক কাগজপত্র, স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং আর্থিক প্রমাণ নিয়ে আবেদন করেন। এই দেশটি ইউরোপের লুকানো রত্ন—যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি মিলে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।