
মন্টিনিগ্রো—এড্রিয়াটিক সমুদ্রের তীরে অবস্থিত এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে এখনো
অপেক্ষাকৃত অজানা। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি একটি আকর্ষণীয় প্রবাসী গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। পোডগোরিত্সা, কোটর, বুডভা—এই শহরগুলো শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বরং কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন শ্রমিক ও পেশাজীবীদের জন্যও একটি আশার আলো। মন্টিনিগ্রোর পর্যটন, হোটেল, নির্মাণ ও কৃষি খাত দ্রুত বর্ধিষ্ণু—ফলে দেশটি নিয়মিত বৈদেশিক শ্রমিক নিয়োগ করছে। কিন্তু এই সুযোগ গ্রহণের আগে জানা অত্যন্ত জরুরি: মন্টিনিগ্রো কাজের ভিসা কীভাবে পাওয়া যায়? এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: মন্টিনিগ্রোর কাজের ভিসার ধরন, আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতা, বেতন, খরচ, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
মন্টিনিগ্রো কাজের ভিসা কী?
মন্টিনিগ্রোতে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় Work Permit এবং Temporary Residence Permit। Work Permit হল আপনার কাজ করার আইনগত অনুমতি, যা মন্টিনিগ্রোর শ্রম মন্ত্রণালয় (Ministry of Labour and Social Welfare) ইস্যু করে। অন্যদিকে, Temporary
Residence Permit হল আপনার আবাসন পারমিট, যা আপনাকে মন্টিনিগ্রোতে আইনগতভাবে থাকার অধিকার দেয়।এই ভিসা সাধারণত 1 বছরের জন্য দেওয়া হয়, যা চুক্তি অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। ভিসার ধরন নির্ভর করে আপনার পেশার উপর—যেমন হোটেল স্টাফ, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, কৃষি শ্রমিক, বা স্কিলড টেকনিশিয়ান। প্রতিটি পেশার জন্য আলাদা যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া প্রযোজ্য।
আবেদন প্রক্রিয়া: কীভাবে ভিসা পাবেন?
মন্টিনিগ্রোর কাজের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে, আপনার মন্টিনিগ্রোর নিয়োগকর্তা আপনার জন্য
Work Permit আবেদন করবেন। এর জন্য তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার মতো দক্ষতা সম্পন্ন স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া যায়নি। এই
প্রক্রিয়ায় সময় লাগে 30 থেকে 45 কর্মদিবস।Work Permit অনুমোদিত হলে, আপনি বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় মন্টিনিগ্রোর দূতাবাসে
(যা ঢাকায় নেই—সাধারণত বেলগ্রেড, সারায়েভো বা বুদাপেস্টে অবস্থিত) ভিসা আবেদন করবেন। এখানে আপনাকে একটি D-type ভিসা (কাজের ভিসা) ইস্যু করা হবে। এই ভিসা নিয়ে আপনি মন্টিনিগ্রোতে প্রবেশ করবেন। মন্টিনিগ্রোতে পৌঁছানোর পর, আপনার নিয়োগকর্তা আপনার জন্য Temporary Residence Permit আবেদন করবেন—যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী থাকার অনুমতি দেবে।সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 2 থেকে 3 মাস। তাই যাত্রার অন্তত 4 মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করা উচিত।
প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র
মন্টিনিগ্রোতে কাজের ভিসার জন্য কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা আছে। প্রথমত, আপনার বয়স হতে হবে 18 থেকে 45 বছর। দ্বিতীয়ত, আপনার কাছে অবশ্যই একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকতে হবে, যার মেয়াদ কমপক্ষে 18 মাস বাকি থাকতে হবে।তৃতীয়ত, আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। হোটেল স্টাফ বা কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারদের জন্য SSC পাস যথেষ্ট, কিন্তু টেকনিশিয়ান বা ম্যানেজারদের জন্য ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি প্রয়োজন।প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হল:
- পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি (4×6 সেমি)
- মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট
- চাকরির অফার লেটার
- শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা অভিজ্ঞতা প্রমাণপত্র
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট
সব কাগজপত্র যাচাই হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বেতন ও সুযোগ-সুবিধা
মন্টিনিগ্রোতে বেতন খাত ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। একজন সাধারণ হোটেল ওয়ার্কার বা কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারের মাসিক বেতন হয় 500 থেকে 700 ইউরো, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় 75,000 থেকে 1,05,000 টাকা। স্কিলড টেকনিশিয়ান বা ম্যানেজারদের বেতন হতে পারে 900 থেকে 1,200 ইউরো, অর্থাৎ 1,35,000 থেকে 1,80,000 টাকা।এছাড়া, মন্টিনিগ্রোর কোম্পানিগুলো সাধারণত নিম্নলিখিত সুবিধা প্রদান করে:
- ফ্রি আবাসন: হোটেল বা কনস্ট্রাকশন সাইটে মেস বা ডরমেটরি
- খাবার: দুই বেলা খাবার (কিছু ক্ষেত্রে তিন বেলা)
- চিকিৎসা বীমা: সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা
- বার্ষিক ছুটি: 15–20 দিনের বার্ষিক ছুটি
- ওভারটাইম: সপ্তাহে 40 ঘণ্টার বেশি কাজের জন্য অতিরিক্ত মজুরি
কিছু হোটেল বা রিসোর্টে ঈদ বোনাস, অ্যাটেনডেন্স বোনাস, বা পারফরম্যান্স বোনাস ও দেওয়া হয়—যা মাসিক আয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
খরচ ও এজেন্ট ফি
মন্টিনিগ্রোর কাজের ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রথমে, ভিসা আবেদন ফি হল 60 থেকে 100 ইউরো, যা প্রায় 9,000 থেকে 15,000 টাকা। এছাড়া, Work Permit ফি হল 100 ইউরো, এবং Residence Permit ফি হল 50 ইউরো।অন্য খরচের মধ্যে রয়েছে:
- পাসপোর্ট ও মেডিকেল টেস্ট: 10,000–15,000 টাকা
- BMET রেজিস্ট্রেশন: 10,000 টাকা
- ফ্লাইট টিকিট: 60,000–90,000 টাকা (বেলগ্রেড বা সারায়েভো হয়ে যেতে হয়)
তবে সবচেয়ে বড় খরচ হল এজেন্ট ফি। অনেক এজেন্ট বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে 1 লাখ থেকে 2 লাখ টাকা নেয়—যদিও এটি আইনত নিষিদ্ধ। মন্টিনিগ্রো সরকার কোনো শ্রমিককে ভিসা আবেদনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করে না।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতা
মন্টিনিগ্রোতে কাজের ভিসা পেতে গিয়ে অনেক শ্রমিক প্রতারণার শিকার হন। কিছু অসৎ এজেন্ট “মন্টিনিগ্রো ভিসা” বলে অন্য দেশের
ভিসা (যেমন: সার্বিয়া, বসনিয়া) দিয়ে পাঠায়। আবার কেউ কেউ “ফ্রি ভিসা” বা “ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজ” এর প্রস্তাব দেয়—যা সম্পূর্ণ অবৈধ।গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
- সবসময় BMET-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্ট ব্যবহার করুন
- চাকরির অফার লেটারে মন্টিনিগ্রোর কোম্পানির ঠিকানা, ট্যাক্স আইডি ও স্বাক্ষর থাকতে হবে
- কখনোই ভিসা ছাড়া মন্টিনিগ্রোতে যাবেন না—অন্যথায় আপনি অবৈধ প্রবাসী হয়ে যাবেন
উপসংহার
মন্টিনিগ্রো কাজের ভিসা মানে শুধু কাজ নয়—এটি একটি সুরক্ষিত, সম্মানজনক ও আইনগত প্রবাসী জীবনের সূচনা। বেতন ভালো, অধিকার সুরক্ষিত, এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সফলতা আসে শুধু তখনই, যখন আপনি সঠিক তথ্য, আইনগত পথ এবং সতর্কতা নিয়ে এগিয়ে যান।