মালয়েশিয়া—এশিয়ার হৃদয়ে অবস্থিত একটি আধুনিক, বহুসাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ। কুয়ালালামপুরের টুইন টাওয়ার,
পেনাংয়ের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, লাঙ্কাউইয়ের সুন্দর সমুদ্র সৈকত, এবং মালয়েশিয়ার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—সব
মিলিয়ে এটি বাংলাদেশি পর্যটক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। কিন্তু
মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: আপনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী কোন ধরনের ভিসা প্রয়োজন? মালয়েশিয়া সরকার
বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের ভিসা প্রদান করে—যেগুলো প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট শর্ত, মেয়াদ ও প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে
গঠিত। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: মালয়েশিয়ায় কী কী ভিসা আছে, কোনটি কার জন্য প্রযোজ্য, কীভাবে আবেদন করবেন, এবং
কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

মালয়েশিয়ার ভিসা ব্যবস্থা: একটি সামগ্রিক পরিচিতি

মালয়েশিয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা বাধ্যতামূলক করেছে। 2024 সাল থেকে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের
জন্য eVISA এবং ENTRI (Electronic Travel Registration & Information) সিস্টেম চালু করেছে। এই সিস্টেমগুলো অনলাইনে
ভিসা আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। মালয়েশিয়ায় প্রধানত চার ধরনের ভিসা রয়েছে: পর্যটক ভিসা, শিক্ষার্থী
ভিসা, কাজের ভিসা, এবং পারিবারিক ভিসা। প্রতিটি ভিসার নিজস্ব নিয়ম, মেয়াদ ও আবেদন প্রক্রিয়া আছে। আপনি যদি শুধু
পর্যটনের জন্য যান, তাহলে eVISA বা ENTRI যথেষ্ট। কিন্তু যদি আপনি পড়াশোনা, কাজ বা পরিবারের সাথে থাকার উদ্দেশ্যে যান,
তাহলে আপনাকে আলাদা ভিসা আবেদন করতে হবে।

পর্যটক ভিসা: eVISA ও ENTRI

মালয়েশিয়ায় পর্যটনের জন্য দুটি প্রধান অপশন আছে: eVISA এবং ENTRI। eVISA হল একটি সাধারণ পর্যটক ভিসা, যা ৩০ দিনের জন্য
দেওয়া হয় এবং একবার প্রবেশের অনুমতি দেয়। এটি আবেদন করতে হয়
https://malaysiavisa.imi.gov.my
ওয়েবসাইটে। আবেদনের জন্য প্রয়োজন হয় পাসপোর্টের স্ক্যান কপি, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ফ্লাইট টিকিট, হোটেল বুকিং, এবং ব্যাংক
স্টেটমেন্ট। প্রসেসিং সময় হল ২ থেকে ৫ কর্মদিবস, এবং খরচ হয় ১৬০ মালয়েশিয়ান রিংগিত (প্রায় ৪০ ডলার)।

  বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যেতে কত টাকা লাগে ২০২৫

অন্যদিকে, ENTRI হল একটি সহজ ও দ্রুত প্রবেশ ব্যবস্থা, যা শুধুমাত্র ১৫ দিনের জন্য বৈধ এবং শুধুমাত্র থাইল্যান্ড বা
সিঙ্গাপুর হয়ে প্রবেশকারীদের জন্য। ENTRI-এর খরচ কম—প্রায় ১২০ রিংগিত, এবং অনুমোদন হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। তবে ENTRI দিয়ে
আপনি মালয়েশিয়ায় কাজ করতে পারবেন না, এবং এটি শুধু পর্যটনের জন্য।

শিক্ষার্থী ভিসা (Student Pass)

মালয়েশিয়া এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। বিশেষ করে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস ও আইটি
কোর্সে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করেন। শিক্ষার্থী ভিসা পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটি মালয়েশিয়ান
সরকার-অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি আপনার জন্য VAL (Visa Approval Letter) ইস্যু করবে, যা
আপনি মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টে জমা দেবেন। এরপর আপনি মালয়েশিয়ায় পৌঁছে Student Pass ইস্যু করবেন। এই ভিসার
মেয়াদ হয় ১ বছর, যা কোর্সের মেয়াদ অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। শিক্ষার্থী ভিসা ধারীরা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত
পার্ট-টাইম কাজ করতে পারেন—যা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আর্থিক সহায়তা হয়ে ওঠে।

কাজের ভিসা (Employment Pass)

মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য প্রধানত দুটি ধরনের ভিসা আছে: Employment Pass (EP) এবং Professional Visit Pass (PVP)।
Employment Pass হল দীর্ঘমেয়াদী কাজের ভিসা, যা ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বৈধ। এটি পেতে হলে আপনার মাসিক বেতন অবশ্যই ৫,০০০
রিংগিতের বেশি হতে হবে, এবং আপনার কাছে কমপক্ষে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি বা সমতুল্য অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আপনার নিয়োগকর্তা
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে (Ministry of Human Resources) আপনার জন্য আবেদন করবেন।

অন্যদিকে, Professional Visit Pass হল স্বল্পমেয়াদী ভিসা—যা ১২ মাসের বেশি নয়। এটি সাধারণত কনসালট্যান্ট, ট্রেনার, বা
টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের জন্য। PVP ধারীরা মালয়েশিয়ায় স্থায়ী চাকরি নিতে পারেন না, এবং তাদের কাজ শেষে দেশে ফিরে আসতে
হয়।

পারিবারিক ভিসা (Dependent Pass)

যদি আপনার স্বামী/স্ত্রী বা পিতা-মাতা মালয়েশিয়ায় কাজ বা পড়াশোনা করেন, তাহলে আপনি Dependent Pass এর মাধ্যমে তাদের
সাথে থাকতে পারেন। এই ভিসার জন্য প্রধান ভিসা ধারীর (যেমন: Employment Pass বা Student Pass ধারী) মাসিক আয় অবশ্যই ৫,০০০
রিংগিতের বেশি হতে হবে। Dependent Pass ধারীরা মালয়েশিয়ায় কাজ করতে পারেন, তবে আলাদাভাবে Work Endorsement নিতে হয়। এই
ভিসার মেয়াদ প্রধান ভিসার মেয়াদের সমান।

  মাল্টা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা 2025

অন্যান্য ভিসা: ব্যবসা, মেডিকেল ও ট্রানজিট

মালয়েশিয়ায় অন্যান্য বিশেষ ভিসাও আছে। ব্যবসায়িক ভিসা হল স্বল্পমেয়াদী—যা মিটিং, কনফারেন্স বা ব্যবসায়িক আলোচনার
জন্য। এটি eVISA এর মাধ্যমে পাওয়া যায়। মেডিকেল ভিসা হল চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা ব্যক্তিদের জন্য—যা মালয়েশিয়ার
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে। আর ট্রানজিট ভিসা হল যারা মালয়েশিয়া হয়ে অন্য দেশে যাচ্ছেন—যাদের জন্য
সাধারণত ১২০ ঘণ্টার মধ্যে প্রবেশ ও প্রস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

মালয়েশিয়ার ভিসা পেতে সহজ হলেও, কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। প্রথমত, আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অবশ্যই ৬ মাসের বেশি
বাকি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুয়া হোটেল বুকিং বা ফ্লাইট টিকিট ব্যবহার করবেন না—কারণ মালয়েশিয়া সরকার এই তথ্য যাচাই
করে। তৃতীয়ত, কাজের ভিসা ছাড়া কোনো ভিসায় কাজ করলে আপনাকে জরিমানা, গ্রেফতার বা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
চতুর্থত, ভিসা আবেদনের সময় সঠিক তথ্য দিন—কারণ ভুল তথ্যের কারণে ভিসা বাতিল হতে পারে।

উপসংহার

মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ভিসা আছে—যা আপনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী নির্বাচন করা যায়। পর্যটন হোক, শিক্ষা হোক, কাজ হোক বা
পরিবার—মালয়েশিয়া সবার জন্য দরজা খুলে রেখেছে। তবে শর্ত হল—আপনি যেন সঠিক ভিসা নিয়ে আইনগত পথে প্রবেশ করেন।