লিথুনিয়া—বাল্টিক অঞ্চলের এই শান্ত, নিরাপদ ও উন্নত দেশটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এখনো অপেক্ষাকৃত অজানা। কিন্তু ধীরে
ধীরে এটি একটি আকর্ষণীয় শিক্ষার্থী গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। ভিলনিয়াস, কাউনাস, ক্লাইপেদা—এই শহরগুলো শুধু ঐতিহাসিক
সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও বিখ্যাত।

লিথুনিয়া স্টুডেন্ট ভিসা কী?

লিথুনিয়ায় পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য National Visa (Type D) প্রয়োজন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ভিসা, যা
শিক্ষার্থীদের লিথুনিয়ায় 1 বছর পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেয়। এই ভিসা পেলে আপনি লিথুনিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন, এবং দেশে
পৌঁছানোর পর Residence Permit আবেদন করতে পারবেন—যা আপনাকে পুরো কোর্সের মেয়াদ পর্যন্ত থাকার অধিকার দেবে।লিথুনিয়া সেনজেন চুক্তিভুক্ত দেশ, তাই এই ভিসা দিয়ে আপনি অন্যান্য সেনজেন দেশেও ভ্রমণ করতে পারবেন—তবে শুধুমাত্র 90 দিনের মধ্যে 90 দিন পর্যন্ত।

আবেদন প্রক্রিয়া: কীভাবে ভিসা পাবেন?

লিথুনিয়া স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল। প্রথমে আপনাকে লিথুনিয়ার কোনো সরকারি বা বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। ভর্তির পর আপনি Letter of Acceptance পাবেন, যা ভিসা আবেদনের জন্য অপরিহার্য।এরপর আপনাকে লিথুনিয়ান দূতাবাসে (যা ঢাকায় নেই—সাধারণত ওয়ারশতে বা রিগায় অবস্থিত) অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন আপনাকে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দূতাবাসে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে আপনার বায়োমেট্রিক্স (আঙুলের ছাপ ও ছবি) নেওয়া হবে, এবং আপনার কাগজপত্র যাচাই করা হবে। কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউতে অংশ নিতে হতে পারে—যেখানে আপনার পড়াশোনার উদ্দেশ্য, থাকার পরিকল্পনা এবং ফেরার ইচ্ছা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 15 থেকে 30 কর্মদিবস। তাই যাত্রার অন্তত 2 মাস আগে আবেদন শুরু করা উচিত।

  সৌদি আরব ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

লিথুনিয়া স্টুডেন্ট ভিসার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কাগজপত্র প্রয়োজন। প্রথমত, আপনার কাছে একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকতে হবে,
যার মেয়াদ যাত্রার শেষ তারিখের পরেও কমপক্ষে 3 মাস বাকি থাকতে হবে, এবং অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে।দ্বিতীয়ত, আপনাকে দুটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি জমা দিতে হবে—যা সাম্প্রতিক এবং সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের হতে হবে।তৃতীয়ত, আপনাকে Letter of Acceptance জমা দিতে হবে—যা লিথুনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত।চতুর্থত, আপনাকে টিউশন ফি পরিশোধের প্রমাণ দিতে হবে—যেমন ব্যাংক রসিদ বা ইউনিভার্সিটির কনফার্মেশন।পঞ্চমত, আপনাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আর্থিক প্রমাণ দিতে হবে—যেখানে দেখানো হবে যে আপনার কাছে জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে। লিথুনিয়া সরকার মাসিক 600 ইউরো আর্থিক প্রমাণ চায়।ষষ্ঠত, আপনাকে ট্রাভেল ইন্সুরেন্স করতে হবে—যা সম্পূর্ণ যাত্রার জন্য বৈধ এবং কমপক্ষে 6,000 ইউরো মেডিকেল কভারেজ সহ।সপ্তমত, আপনাকে ভ্রমণ পরিকল্পনা ও হোটেল বুকিং জমা দিতে হবে—যা আপনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের থাকার ব্যবস্থা প্রমাণ করবে।

ভিসা ফি ও অন্যান্য খরচ

লিথুনিয়া স্টুডেন্ট ভিসার ফি হল 80 ইউরো (প্রায় 12,000 টাকা)। এই ফি সকল প্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর জন্য একই।এছাড়া,
দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন করলে অতিরিক্ত সার্ভিস ফি লাগে না, কিন্তু যদি আপনি কোনো ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করেন,
তাহলে তাদের ফি আলাদা হতে পারে।অন্যান্য খরচের মধ্যে রয়েছে:

  • ফ্লাইট টিকিট: ঢাকা থেকে ওয়ারশ/রিগা হয়ে ভিলনিয়াস—70,000 থেকে 1,10,000 টাকা
  • টিউশন ফি: বার্ষিক 2,000 থেকে 4,500 ইউরো (প্রায় 3 লাখ থেকে 7 লাখ টাকা)
  • আবাসন: মাসিক 200–400 ইউরো (প্রায় 30,000–60,000 টাকা)
  • খাবার ও পরিবহন: মাসিক 25,000–40,000 টাকা

মোট কথা, লিথুনিয়ায় এক বছরের পড়াশোনার মোট খরচ হতে পারে 5 থেকে 8 লাখ টাকা—যা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় অনেক কম।

সুযোগ ও পার্ট-টাইম কাজ

লিথুনিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসা ধারীরা সেমিস্টারের সময় সপ্তাহে 20 ঘণ্টা এবং ছুটির সময় ফুল-টাইম কাজ করতে পারেন। এটি
শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সুবিধা—কারণ এটি তাদের জীবনযাত্রার খরচ কমাতে সাহায্য করে।সাধারণ পার্ট-টাইম কাজের মধ্যে
রয়েছে:

  • ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে ওয়েটার
  • লাইব্রেরিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট
  • অনলাইন টিউশন বা ফ্রিল্যান্সিং
  • ক্যাম্পাসে ক্লিনার বা সিকিউরিটি
  ইতালিতে কোন কাজের চাহিদা বেশি

ঘণ্টাপ্রতি মজুরি হয় 5–8 ইউরো, যা মাসিক 15,000–25,000 টাকা আয়ের সুযোগ দেয়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

অনেক শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের সময় ভুল করেন। প্রথমত, তারা ভুয়া অফার লেটার ব্যবহার করেন—যা ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ।
শুধুমাত্র লিথুনিয়ান সরকার-অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার নিন।দ্বিতীয়ত, তারা ব্যাংক স্টেটমেন্টে হঠাৎ বড় অঙ্ক
জমা করেন—যা দূতাবাস সন্দেহ করে। অর্থ অবশ্যই ধীরে ধীরে জমা হতে হবে।তৃতীয়ত, তারা ইন্টারভিউতে অস্পষ্ট উত্তর দেন—যেমন “কেন লিথুনিয়া?” এর উত্তরে “শুধু ইউরোপে যেতে চাই”। এটি অবিশ্বাস্য মনে হয়। বরং বলুন যে আপনি লিথুনিয়ার শিক্ষার মান, নিরাপত্তা ও কম খরচের কারণে এখানে পড়তে চান।

উপসংহার

লিথুনিয়া স্টুডেন্ট ভিসা মানে শুধু পড়াশোনা নয়—এটি একটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচয়, এবং
ভবিষ্যতের গ্লোবাল ক্যারিয়ারের দ্বার। এখানে শিক্ষা মানসম্পন্ন, খরচ কম, এবং পরিবেশ নিরাপদ। কিন্তু সফলতা আসে শুধু তখনই,
যখন আপনি সঠিক প্রস্তুতি, সত্য তথ্য এবং আইনগত পথ অনুসরণ করেন।