সেনজেন ভিসা—এই শব্দটি শুনলেই অনেক বাংলাদেশি পর্যটক, ছাত্র বা ব্যবসায়ীর চোখে স্বপ্ন জেগে ওঠে। কারণ এই ভিসা মানে হল
ইউরোপের 29টি দেশে ঘোরার মুক্ত অধিকার—ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, পর্তুগাল ইত্যাদি দেশগুলোতে
একই ভিসায় প্রবেশ করা যায়। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: সেনজেন ভিসা পাওয়ার উপায় কী? অনেকেই
মনে করেন যে সেনজেন ভিসা পাওয়া অসম্ভব কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হল—এটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। শর্ত হল আপনি যেন সঠিক
পদ্ধতি, সঠিক কাগজপত্র এবং স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে আবেদন করেন। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: সেনজেন ভিসা কী, কোন দেশে আবেদন করবেন, কী কাগজপত্র লাগবে, কত খরচ হবে, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সেনজেন ভিসা কী?

সেনজেন ভিসা হল ইউরোপের সেনজেন চুক্তিভুক্ত 29টি দেশে প্রবেশ ও ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ভিসা। এই চুক্তি অনুযায়ী, এই
দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমা নেই—অর্থাৎ একবার ভিসা পেলে আপনি যেকোনো সেনজেন দেশে ঘুরতে পারবেন ছাড়পত্র ছাড়া। এই ভিসা মূলত দুই ধরনের হয়: Short-Stay Visa (Type C) এবং Long-Stay Visa (Type D)। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সাধারণত Type C ভিসা প্রযোজ্য—যা 180 দিনের মধ্যে 90 দিন পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেয়।এই ভিসা পর্যটন, ব্যবসায়িক সভা, পারিবারিক সফর বা
স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া হয়। তবে এটি দিয়ে কাজ করা যায় না।

কোন দেশে আবেদন করবেন?

সেনজেন ভিসার জন্য আবেদন করতে হয় আপনার প্রধান গন্তব্য দেশের দূতাবাস বা ভিসা সেন্টারে। যদি আপনি একাধিক দেশ ঘুরার
পরিকল্পনা করেন, তাহলে সেই দেশে আবেদন করবেন যেখানে আপনি সবচেয়ে বেশি দিন থাকবেন। যদি সমান দিন থাকেন, তাহলে সেই দেশে আবেদন করবেন যেখানে আপনি প্রথম প্রবেশ করবেন।উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি 5 দিন ফ্রান্সে, 3 দিন ইটালিতে এবং 2 দিন স্পেনে থাকেন, তাহলে আপনাকে ফ্রান্সের দূতাবাসে আবেদন করতে হবে। ভুল দেশে আবেদন করলে আপনার আবেদন বাতিল হতে পারে।

  মরিশাস কাজের ভিসা ২০২৫

আবেদন প্রক্রিয়া

সেনজেন ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল এবং প্রত্যক্ষ। প্রথমে আপনাকে আপনার গন্তব্য দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে
গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করতে হবে। ঢাকায় অবস্থিত অধিকাংশ ইউরোপীয় দূতাবাস VFS Global বা TLScontact-এর মাধ্যমে ভিসা
প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন আপনাকে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ভিসা সেন্টারে উপস্থিত হতে হবে।
সেখানে আপনার বায়োমেট্রিক্স (আঙুলের ছাপ ও ছবি) নেওয়া হবে, এবং আপনার কাগজপত্র যাচাই করা হবে। কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে
সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউতে অংশ নিতে হতে পারে—যেখানে আপনার যাত্রার উদ্দেশ্য, থাকার স্থান এবং ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা
করা হবে।পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে 15 থেকে 30 কর্মদিবস। তাই যাত্রার অন্তত 2 মাস আগে আবেদন শুরু করা উচিত।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

সেনজেন ভিসার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কাগজপত্র প্রয়োজন। প্রথমত, আপনার কাছে একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকতে হবে, যার মেয়াদ যাত্রার শেষ তারিখের পরেও কমপক্ষে 3 মাস বাকি থাকতে হবে, এবং অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে।দ্বিতীয়ত, আপনাকে দুটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি জমা দিতে হবে—যা সাম্প্রতিক এবং সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের হতে হবে।তৃতীয়ত, আপনাকে একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা (Itinerary) জমা দিতে হবে—যেখানে আপনার আগমন ও প্রস্থানের তারিখ, প্রতিটি দেশে থাকার স্থান, এবং ঘোরার পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে।চতুর্থত, আপনাকে হোটেল বুকিং কনফার্মেশন দিতে হবে—যা আপনার সম্পূর্ণ যাত্রার জন্য হতে হবে। কিছু দেশ (যেমন: ফ্রান্স, জার্মানি) এটি কঠোরভাবে চায়।পঞ্চমত, আপনাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আর্থিক প্রমাণ দিতে হবে—যেখানে দেখানো হবে যে আপনার কাছে যাত্রার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে। সাধারণত প্রতি দিনের জন্য 60–100 ইউরো হিসাবে প্রমাণ করতে হয়।ষষ্ঠত, আপনাকে ফ্লাইট টিকিটের কনফার্মেশন দিতে হবে—যেখানে আগমন ও প্রস্থান উভয় তারিখ উল্লেখ থাকবে।সপ্তমত, আপনাকে ট্রাভেল ইন্সুরেন্স করতে হবে—যা সম্পূর্ণ যাত্রার জন্য বৈধ এবং কমপক্ষে 30,000 ইউরো মেডিকেল কভারেজ সহ।

  স্পন্সর ভিসা মানে কি?

ভিসা ফি ও অন্যান্য খরচ

সেনজেন ভিসার ফি হল 80 ইউরো (প্রায় 12,000 টাকা)। এই ফি সকল প্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর জন্য একই। শিশু (6–12 বছর) এর জন্য ফি হল 40 ইউরো, আর 6 বছরের কম শিশুদের জন্য ফি নেই।এছাড়া, VFS Global বা TLScontact এর সার্ভিস ফি হিসেবে 2,000–3,000 টাকা অতিরিক্ত লাগে।অন্যান্য খরচের মধ্যে রয়েছে:

  • ফ্লাইট টিকিট: ঢাকা থেকে ইউরোপ রাউন্ড ট্রিপের জন্য 1.2 থেকে 2 লাখ টাকা
  • হোটেল বুকিং: প্রতি রাতে 5,000 থেকে 10,000 টাকা
  • ট্রাভেল ইন্সুরেন্স: 2,000–4,000 টাকা

মোট কথা, একজন বাংলাদেশি পর্যটকের জন্য 10–15 দিনের ইউরোপ সফরের মোট খরচ হতে পারে 3 থেকে 5 লাখ টাকা।

সফল আবেদনের কৌশল

সেনজেন ভিসা পাওয়ার জন্য কয়েকটি কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমত, আপনার যাত্রার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতে হবে। “শুধু ঘুরব” বললে ভিসা বাতিল হতে পারে। বরং বলুন যে আপনি “প্যারিসে ইফেল টাওয়ার দেখবেন”, “রোমে ভ্যাটিকান সিটি ঘুরবেন”
ইত্যাদি।দ্বিতীয়ত, আপনার ব্যাংক স্টেটমেন্টে অর্থ ধীরে ধীরে জমা হওয়া উচিত—হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা করলে সন্দেহ হয়।তৃতীয়ত,
আপনার পারিবারিক সম্পর্ক শক্তিশালী হতে হবে—যেমন চাকরি, সম্পত্তি, পরিবার। এটি প্রমাণ করে যে আপনি বাংলাদেশে ফিরে
আসবেন।চতুর্থত, আপনি যদি আগে কোনো উন্নত দেশে ভিসা পেয়ে থাকেন (যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য), তাহলে তা আপনার
আবেদনের পক্ষে কাজ করবে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

অনেক আবেদনকারী ভুল করেন। প্রথমত, তারা ভুয়া হোটেল বুকিং ব্যবহার করেন—যা দূতাবাস যাচাই করে। দ্বিতীয়ত, তারা অস্পষ্ট ভ্রমণ পরিকল্পনা জমা দেন—যা ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ।তৃতীয়ত, তারা ইন্টারভিউতে অস্পষ্ট উত্তর দেন—যেমন “কোথায় থাকবেন?” এর উত্তরে “কোথাও থাকব”। এটি অবিশ্বাস্য মনে হয়।চতুর্থত, তারা ভিসা ফলাফলের আগে ফ্লাইট টিকিট বা হোটেল বুক করে ফেলেন—যা অর্থ নষ্টের কারণ হতে পারে।

উপসংহার

সেনজেন ভিসা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে আপনার প্রস্তুতি, সত্যতা এবং স্পষ্টতার উপর। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী শহর, সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আপনার অপেক্ষায় আছে—শুধু আপনাকে সঠিক পথে হাঁটতে হবে।