ইউরোপে ভ্রমণ বা পড়াশোনা কিংবা কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। আর এই স্বপ্নের সঙ্গে একটি শব্দ বারবার উঠে
আসে — “শেনজেন ভিসা”। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে শেনজেন আসলে কী, এই চুক্তির আওতায় কতটি দেশ রয়েছে এবং একটি ভিসায় কতগুলো দেশ ভ্রমণ করা সম্ভব। এই আর্টিকেলে আমরা সেনজেন ভুক্ত দেশ কয়টি সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

শেনজেন চুক্তি কী?

শেনজেন চুক্তি (Schengen Agreement) হলো ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি, যা ১৯৮৫ সালের ১৪ই জুন লুক্সেমবার্গের ছোট্ট শহর “শেনজেন”-এ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে মুক্ত
চলাচলের সুযোগ তৈরি করা।

চুক্তিটি কার্যকর হয় ১৯৯৫ সালে এবং তখন থেকে শেনজেন অঞ্চলের দেশগুলোতে একটি মাত্র ভিসায় ভ্রমণ করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ,
আপনি যদি একটি শেনজেন ভিসা পান, তাহলে এই চুক্তির আওতাভুক্ত সব দেশেই অবাধে যাতায়াত করতে পারবেন — আলাদা আলাদা ভিসার প্রয়োজন হবে না। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় “Schengen Area” বা শেনজেন অঞ্চল, যা আজকের দিনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত চলাচল অঞ্চলগুলোর একটি।

সেনজেন ভুক্ত দেশ কয়টি?

বর্তমানে (২০২৪ সাল পর্যন্ত) শেনজেন অঞ্চলে মোট ২৯টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্য এবং ৪টি ইইউ-বহির্ভূত দেশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সব দেশ শেনজেন অঞ্চলের সদস্য নয়, আবার শেনজেন অঞ্চলের সব সদস্য ইইউর সদস্য নয়।

  বাংলাদেশ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত সময় লাগে

শেনজেন অন্তর্ভুক্ত ২৯টি দেশের তালিকা

নিচে বর্তমানে শেনজেন অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর নাম বাংলা ও ইংরেজিতে দেওয়া হলো:

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত শেনজেন দেশসমূহ (২৫টি):

১.
অস্ট্রিয়া
(Austria)

২.
বেলজিয়াম
(Belgium)

৩.
বুলগেরিয়া
(Bulgaria)

৪.
ক্রোয়েশিয়া
(Croatia)

৫.
চেক রিপাবলিক
(Czech Republic)

৬.
ডেনমার্ক
(Denmark)

৭.
এস্তোনিয়া
(Estonia)

৮.
ফিনল্যান্ড
(Finland)

৯.
ফ্রান্স
(France)

১০.
জার্মানি
(Germany)

১১.
গ্রিস
(Greece)

১২.
হাঙ্গেরি
(Hungary)

১৩.
ইতালি
(Italy)

১৪.
লাটভিয়া
(Latvia)

১৫.
লিথুয়ানিয়া
(Lithuania)

১৬.
লুক্সেমবার্গ
(Luxembourg)

১৭.
মাল্টা
(Malta)

১৮.
নেদারল্যান্ডস
(Netherlands)

১৯.
পোল্যান্ড
(Poland)

২০.
পর্তুগাল
(Portugal)

২১.
রোমানিয়া
(Romania)

২২.
স্লোভাকিয়া
(Slovakia)

২৩.
স্লোভেনিয়া
(Slovenia)

২৪.
স্পেন
(Spain)

২৫.
সুইডেন
(Sweden)

ইইউ-বহির্ভূত শেনজেন দেশসমূহ (৪টি):

২৬.
আইসল্যান্ড
(Iceland)

২৭.
লিশটেনস্টেইন
(Liechtenstein)

২৮.
নরওয়ে
(Norway)

২৯.
সুইজারল্যান্ড
(Switzerland)

সর্বশেষ সংযোজন: রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া

২০২৪ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেনজেন অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হয়েছে (বিমান ও সমুদ্রপথে), যা ছিল অনেক দিনের প্রতীক্ষিত একটি ঘটনা। স্থলসীমান্তে তাদের শেনজেন অন্তর্ভুক্তি ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে কার্যকর হয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ক্রোয়েশিয়া শেনজেন অঞ্চলে যোগ দিয়েছিল, যা ছিল এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

কোন ইইউ দেশগুলো এখনো শেনজেনে নেই?

কিছু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ এখনো শেনজেন অঞ্চলে যোগ দেয়নি। এরা হলো:

  • আয়ারল্যান্ড
    — ঐতিহাসিক কারণে নিজস্ব সীমান্ত নীতি বজায় রাখে এবং শেনজেনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
  • সাইপ্রাস
    — ইইউ সদস্য হলেও শেনজেনে এখনো পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি; তবে ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এছাড়া ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য এখন আর ইইউ বা শেনজেনের অংশ নয়।

শেনজেন ভিসা দিয়ে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়?

শেনজেন ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো — একটি ভিসা দিয়ে ২৯টি দেশে ভ্রমণ করার স্বাধীনতা। এর বাইরে আরো অনেক সুবিধা রয়েছে:

১. মুক্ত চলাচল:
শেনজেন দেশগুলোর মধ্যে ভ্রমণ করতে পাসপোর্ট দেখাতে হয় না। সীমান্তে থামতে হয় না।

২. সময় সাশ্রয়:
একাধিক দেশে ভ্রমণের জন্য আলাদা আলাদা ভিসার আবেদন করতে হয় না।

  কিরগিজস্তান ভিসা চেক ঘরে বসে

৩. অর্থ সাশ্রয়:
আলাদা ভিসা ফি দেওয়া লাগে না।

৪. নমনীয়তা:
৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো দেশে যাওয়া-আসা করা যায়।

শেনজেন ভিসার ধরন

শেনজেন ভিসা সাধারণত কয়েক ধরনের হয়ে থাকে:

ক) ক্যাটাগরি A (Airport Transit Visa):
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ট্রানজিটের জন্য। বিমানের ট্রানজিট এলাকায় থাকার অনুমতি দেয়, কিন্তু দেশে প্রবেশের অনুমতি নেই।

খ) ক্যাটাগরি C (Short-Stay Visa):
সবচেয়ে প্রচলিত ভিসা। যেকোনো ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন থাকার অনুমতি দেয়। পর্যটন, ব্যবসা, পরিবার পরিদর্শন,
সংক্ষিপ্ত কোর্স ইত্যাদির জন্য প্রযোজ্য।

গ) ক্যাটাগরি D (National/Long-Stay Visa):
কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশে দীর্ঘমেয়াদি থাকার জন্য — পড়াশোনা, কাজ বা পরিবার পুনর্মিলনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই ভিসায়
অন্য শেনজেন দেশেও ৯০ দিন পর্যন্ত ঘুরে আসা যায়।

শেনজেন ভিসার জন্য কোন দেশে আবেদন করবেন?

যদি আপনি একাধিক শেনজেন দেশে যেতে চান, তাহলে যে দেশে সবচেয়ে বেশি দিন থাকবেন সেই দেশের দূতাবাসে ভিসার আবেদন করতে হবে। আর যদি সমান সময়ের জন্য একাধিক দেশে থাকেন, তাহলে যে দেশে প্রথমে প্রবেশ করবেন সেই দেশের দূতাবাসে আবেদন করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ফ্রান্সে ৫ দিন, জার্মানিতে ৩ দিন এবং ইতালিতে ২ দিন থাকার পরিকল্পনা করেন, তাহলে ফ্রান্সের দূতাবাসে আবেদন করতে হবে।

শেনজেন ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

বাংলাদেশ থেকে শেনজেন ভিসার আবেদন করতে হলে সাধারণত যা যা লাগে:

  • বৈধ পাসপোর্ট (অন্তত ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে)
  • পূরণকৃত ভিসা আবেদন ফর্ম
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী)
  • ভ্রমণ বীমা (ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স) — কমপক্ষে ৩০,০০০ ইউরো কভারেজ
  • হোটেল বুকিং বা আবাসনের প্রমাণ
  • ফ্লাইট বুকিং কনফার্মেশন
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট (সাধারণত শেষ ৩-৬ মাসের)
  • চাকরির প্রমাণ বা ব্যবসার নথি
  • ভিসা ফি পরিশোধের রসিদ
  • ভ্রমণের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত চিঠি (Cover Letter)

শেনজেন ভিসা পেতে কতদিন লাগে?

সাধারণত আবেদনের পর ১৫ কর্মদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে জটিল ক্ষেত্রে বা মৌসুমি ব্যস্ততার সময় এটি ৩০ থেকে ৬০
দিন পর্যন্ত লাগতে পারে। তাই ভ্রমণের অন্তত ১৫ কার্যদিবস আগে আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

  সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা বেতন কত

৯০/১৮০ দিনের নিয়ম কী?

শেনজেন ভিসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম রয়েছে যা অনেকে না জানার কারণে সমস্যায় পড়েন। এই নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ১৮০
দিনের মধ্যে আপনি সর্বোচ্চ ৯০ দিন শেনজেন অঞ্চলে থাকতে পারবেন। অর্থাৎ, আপনি যদি জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৯০ দিন ব্যবহার করেন, তাহলে পরবর্তী ৯০ দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি আর শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই নিয়ম ভঙ্গ করলে ভবিষ্যতে ভিসা প্রত্যাখ্যান, জরিমানা বা দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারেন।

শেনজেন দেশগুলো ভ্রমণের টিপস

১. প্রথম প্রবেশের দেশ গুরুত্বপূর্ণ:
আপনার ভিসা যে দেশের, সেই দেশ দিয়ে প্রথমে প্রবেশ করা উচিত।

২. ভ্রমণ বীমা অবশ্যই নিন:
এটি শুধু ভিসার শর্ত নয়, বিদেশে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে আপনাকে সুরক্ষিত রাখবে।

৩. পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ রাখুন:
প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (সাধারণত ৫০-১০০ ইউরো) থাকার প্রমাণ চাওয়া হয়।

৪. ইটিআইএস (ETIAS) সম্পর্কে জানুন:
২০২৫ সালের মধ্যে শেনজেন অঞ্চলে ভিসা-মুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ETIAS (European Travel Information and Authorisation System) চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাংলাদেশিদের এখনো পূর্ণ শেনজেন ভিসাই লাগবে।

৫. রিজেকশন ইতিহাস এড়িয়ে চলুন:
আগে কখনো ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে তা ফর্মে উল্লেখ করুন এবং সেই প্রত্যাখ্যানের কারণ যেন এবার না থাকে সেটি নিশ্চিত করুন।

শেনজেন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ

শেনজেন অঞ্চল ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। আগামীতে সাইপ্রাস এবং সম্ভবত অন্যান্য ইউরোপীয় দেশও এই অঞ্চলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শেনজেন অঞ্চলকে আরো শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং উন্নত ভিসা তথ্যব্যবস্থা চালু করতে কাজ করছে।

সংক্ষেপে: শেনজেন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয় তথ্য
মোট সদস্য দেশ ২৯টি
ইইউভুক্ত সদস্য ২৫টি
ইইউ-বহির্ভূত সদস্য ৪টি (আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, লিশটেনস্টেইন)
চুক্তি স্বাক্ষর ১৪ জুন ১৯৮৫
কার্যকর হয় ১৯৯৫ সালে
সর্বোচ্চ অবস্থানকাল ১৮০ দিনে ৯০ দিন
সর্বশেষ যোগদান রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া (২০২৪)

উপসংহার

শেনজেন অঞ্চল শুধু একটি ভ্রমণ ব্যবস্থা নয়, এটি ইউরোপীয় একতা ও মুক্ত চলাচলের এক অসাধারণ নিদর্শন। বর্তমানে ২৯টি দেশ
নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য স্বপ্নের গন্তব্য।

বাংলাদেশ থেকে যারা ইউরোপ যেতে চান, তাদের জন্য শেনজেন ভিসা হলো সেই সুবর্ণ চাবিকাঠি যা একসাথে ২৯টি দেশের দরজা খুলে দেয়। তাই ভিসার আবেদনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক রাখুন, ৯০/১৮০ দিনের নিয়ম ভালোভাবে বুঝুন এবং পরিকল্পনামাফিক আবেদন করুন — তাহলে ইউরোপ ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণ হওয়া কঠিন কিছু নয়।