
কানাডা—উত্তর আমেরিকার এই শীতল, নিরাপদ ও উন্নত দেশটি বাংলাদেশি যুবক-যুবতীদের কাছে শুধু একটি গন্তব্য নয়, এটি একটি
স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষা, কাজের সুযোগ, স্থায়ী বসবাস, বা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য—অসংখ্য কারণে প্রতি বছর হাজার
হাজার বাংলাদেশি কানাডায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে প্রথমে জানতে হবে: কানাডার ভিসা
কিভাবে পাওয়া যায়?
উপস্থাপনা
কানাডার ভিসা ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি গঠনমূলক, ডিজিটাল এবং প্রতিযোগিতামূলক। এখানে শুধু আবেদন করলেই
হবে না—আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি কানাডার জন্য উপযুক্ত প্রার্থী। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: কানাডায় কী কী
ধরনের ভিসা আছে, কীভাবে আবেদন করবেন, কী কী ডকুমেন্ট লাগবে, কত সময় লাগবে, এবং কী কী ভুল এড়াতে হবে।
কানাডার ভিসা ব্যবস্থা: একটি সামগ্রিক পরিচিতি
কানাডা মূলত দুই ধরনের ভিসা প্রদান করে: Temporary Resident Visa (TRV) এবং Permanent Resident Visa (PR)। TRV হল
স্বল্পমেয়াদী ভিসা—যা পর্যটন, শিক্ষা বা কাজের জন্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে, PR হল স্থায়ী বসবাসের অনুমতি—যা কানাডায়
চিরস্থায়ী বসবাস, কাজ করা এবং পরিবার নিয়ে আসার অধিকার দেয়।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কানাডার ভিসা বাধ্যতামূলক—অর্থাৎ
কানাডায় প্রবেশের জন্য ভিসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে
https://www.canada.ca/en/immigration-refugees-citizenship
ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হয়। এখানে আপনাকে আপনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী সঠিক ভিসা ক্যাটাগরি নির্বাচন করতে হবে।
পর্যটক ভিসা (Visitor Visa / TRV)
যদি আপনি কানাডায় পর্যটন, পরিবার দেখা বা স্বল্পমেয়াদী ব্যবসায়িক কাজের উদ্দেশ্যে যান, তাহলে আপনার প্রয়োজন হবে
Temporary Resident Visa (TRV)। এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত 6 মাস, তবে কিছু ক্ষেত্রে 10 বছর পর্যন্ত মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা
দেওয়া হয়।
আবেদনের জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কানাডায় থাকার জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে, আপনি কানাডা থেকে ফিরে
আসবেন, এবং আপনার বাংলাদেশে স্থায়ী সম্পর্ক (যেমন: চাকরি, সম্পত্তি, পরিবার) আছে। আপনাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চাকরির
লেটার, পাসপোর্ট, ছবি, এবং কানাডায় থাকার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। প্রসেসিং সময় গড়ে 4 থেকে 8 সপ্তাহ, এবং খরচ হয় CAD
100 (প্রায় 8,500 টাকা)।
শিক্ষার্থী ভিসা (Study Permit)
কানাডা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষার্থী গন্তব্য। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কানাডায় উচ্চশিক্ষা
গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থী ভিসা পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটি DLI (Designated Learning Institution)-এ ভর্তি হতে হবে—যা
কানাডা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। ভর্তির পর আপনি Letter of Acceptance পাবেন, যা ভিসা আবেদনের জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া,
আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কোর্স ফি ও জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে—সাধারণত CAD 10,000–15,000
প্রতি বছর। শিক্ষার্থী ভিসা ধারীরা সেমিস্টারের সময় সপ্তাহে 20 ঘণ্টা এবং ছুটির সময় ফুল-টাইম কাজ করতে পারেন। প্রসেসিং
সময় হল 6 থেকে 12 সপ্তাহ, এবং খরচ হয় CAD 150।
কাজের ভিসা (Work Permit)
কানাডায় কাজ করার জন্য আপনার প্রয়োজন হবে Work Permit। এটি দুই ধরনের: Employer-Specific Work Permit এবং Open Work
Permit। Employer-Specific ভিসায় আপনি শুধু একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য কাজ করতে পারবেন, যার জন্য আপনার কাছে LMIA
(Labour Market Impact Assessment) বা LMIA-Exempt Job Offer লাগবে।
অন্যদিকে, Open Work Permit ধারীরা যেকোনো কোম্পানির
জন্য কাজ করতে পারেন—যেমন শিক্ষার্থীদের পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট (PGWP)। PGWP-এর মেয়াদ হয় কোর্সের দৈর্ঘ্য
অনুযায়ী—সর্বোচ্চ 3 বছর। এই সময়ের মধ্যে আপনি কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা (PR) হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।
স্থায়ী বসবাস (Permanent Residency – PR)
কানাডার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রবাস পথ হল Express Entry সিস্টেম। এটি একটি পয়েন্ট-ভিত্তিক সিস্টেম, যেখানে আপনার বয়স,
শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি/ফরাসি দক্ষতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে CRS (Comprehensive Ranking System) স্কোর
দেওয়া হয়।
প্রতি দুই সপ্তাহে কানাডা সরকার একটি ড্র করে, এবং নির্দিষ্ট স্কোরের উপরে থাকলে আপনি Invitation to Apply
(ITA) পাবেন। এরপর আপনি PR এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রসেসিং সময় হল 6 মাস, এবং খরচ হয় CAD 1,525 (আবেদন ফি +
প্রাইমারি অ্যাপ্লিক্যান্ট)। এছাড়া, Provincial Nominee Program (PNP)-এর মাধ্যমেও PR পাওয়া যায়—যেখানে কানাডার বিভিন্ন
প্রদেশ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবাসী নির্বাচন করে।
আবেদনের ধাপগুলো
কানাডার ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে হয়। প্রথমে আপনি IRCC (Immigration, Refugees and Citizenship Canada)
ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভিসা ক্যাটাগরি নির্বাচন করবেন। এরপর আপনাকে একটি GCKey অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে
হবে।
তারপর আপনি সকল প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করবেন—যেমন পাসপোর্ট, ছবি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শিক্ষাগত সার্টিফিকেট,
ইংরেজি টেস্ট (IELTS/CELPIP), এবং চাকরির লেটার। এরপর আপনি অনলাইনে ফি পরিশোধ করবেন। শেষে, আপনাকে Biometrics (আঙুলের ছাপ
ও ছবি) দিতে হবে—যা ঢাকার VFS Global সেন্টারে দেওয়া যায়। এরপর আপনার আবেদন প্রসেসিংয়ে চলে যাবে।
সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
অনেক আবেদনকারী কানাডার ভিসা প্রক্রিয়ায় কিছু সাধারণ ভুল করেন। প্রথমত, তারা ভুয়া বা অস্পষ্ট ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা
দেন—যা ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ। দ্বিতীয়ত, তারা ইংরেজি টেস্টে কম স্কোর নিয়ে আবেদন করেন—যা CRS স্কোর কমিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, তারা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দেয় না—যেমন চাকরির প্রমাণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট। চতুর্থত, তারা
মিথ্যা তথ্য দেয়—যা ভবিষ্যতে কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আনতে পারে। তাই সবসময় সত্য ও স্পষ্ট তথ্য দিন, এবং প্রয়োজনে
একজন অভিজ্ঞ ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টের সহায়তা নিন।
উপসংহার
কানাডার ভিসা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে আপনার প্রস্তুতি, যোগ্যতা এবং সততার উপর। কানাডা চায় দক্ষ, সৎ
ও উদ্যমী মানুষ—যারা দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখবে। তাই আপনি যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন, সঠিক পথে হাঁটেন, এবং আইনগত
প্রক্রিয়া মেনে চলেন, তাহলে কানাডার দরজা আপনার জন্য খোলা থাকবে।