মালয়েশিয়া—এশিয়ার এই উন্নত, বহুসাংস্কৃতিক ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশটি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে একটি আকর্ষণীয়
গন্তব্য হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ফ্যাক্টরি খাতে কাজের সুযোগ খুঁজছেন এমন যুবক-যুবতীদের জন্য মালয়েশিয়া এখন একটি
গুরুত্বপূর্ণ পছন্দ।

মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিক্স, গার্মেন্টস, ফুড প্রসেসিং, রাবার ও অটোমোবাইল শিল্প দ্রুত বর্ধিষ্ণু—ফলে
দেশটি নিয়মিত বৈদেশিক শ্রমিক নিয়োগ করছে। কিন্তু এই সুযোগ গ্রহণের আগে জানা অত্যন্ত জরুরি: মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরি
ভিসায় বেতন কত? অনেকেই মনে করেন যে মালয়েশিয়ায় ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের মাসিক আয় 50,000–70,000 টাকা। কিন্তু বাস্তবতা
কিছুটা ভিন্ন।

এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানব: মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরি ভিসার ধরন, বেতনের হার, ওভারটাইম, সুযোগ-সুবিধা,
খরচ, এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরি ভিসা কী?

মালয়েশিয়ায় ফ্যাক্টরিতে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় Employment Pass (Category III) বা Work Permit। এটি এক ধরনের কাজের
ভিসা, যা মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (Ministry of Human Resources) কর্তৃক ইস্যু করা হয়। এই ভিসা শুধুমাত্র
নির্দিষ্ট ফ্যাক্টরি বা কোম্পানির অধীনে কাজ করার অনুমতি দেয়। ভিসাটি সাধারণত 1 থেকে 2 বছরের জন্য দেওয়া হয়, যা চুক্তি
অনুযায়ী রিনিউ করা যায়। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি মালয়েশিয়ায় আইনগতভাবে কাজ করতে পারবেন, এবং আপনার অধিকার মালয়েশিয়ার শ্রম আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।

ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের বেতন: কত টাকা?

মালয়েশিয়া সরকার 2024 সালে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে 1,700 মালয়েশিয়ান রিংগিত (MYR) প্রতি মাসে। এটি সব খাতের জন্য
প্রযোজ্য—ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের জন্যও। তবে বাস্তবতায়, বেশিরভাগ ফ্যাক্টরি এই ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বেশি দেয়।একজন সাধারণ
ফ্যাক্টরি অপারেটরের মাসিক বেতন হয় 1,800 থেকে 2,500 MYR। বাংলাদেশি টাকায় (1 MYR ≈ 25 BDT ধরে), এটি প্রায় 45,000 থেকে 62,500 টাকা। যদি আপনি টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর বা সুপারভাইজার হন, তাহলে আপনার বেতন হতে পারে 3,000 MYR পর্যন্ত—যা প্রায় 75,000 টাকা।এছাড়া, মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরিগুলো সাধারণত ওভারটাইম (OT) দেয়। শ্রম আইন অনুযায়ী, সপ্তাহে 48 ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত মজুরি দিতে হয়। ওভারটাইমের হার হল:

  • সাধারণ দিনে: 1.5 গুণ
  • ছুটির দিনে: 2 গুণ
  • জাতীয় ছুটির দিনে: 3 গুণ
  সুইজারল্যান্ড যেতে কত টাকা লাগবে

গড়ে, একজন শ্রমিক মাসে 200–500 MYR ওভারটাইম আয় করতে পারেন—যা বাংলাদেশি টাকায় 5,000 থেকে 12,500 টাকা।

সুযোগ-সুবিধা: কী কী পাবেন?

মালয়েশিয়ার অধিকাংশ ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের জন্য নিম্নলিখিত সুবিধা প্রদান করে:

  • ফ্রি আবাসন: সাধারণত ফ্যাক্টরি ক্যাম্পাসে ডরমেটরি বা মেস ব্যবস্থা থাকে। কক্ষে 4–8 জন শ্রমিক থাকেন।
  • খাবার: দুই বেলা খাবার (সকাল ও রাত) সাধারণত ফ্রি। কিছু ফ্যাক্টরিতে দুপুরের খাবারও দেওয়া হয়।
  • চিকিৎসা বীমা: সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা বা প্রাইভেট ক্লিনিকে সাবসিডি দেওয়া হয়।
  • বার্ষিক ছুটি: 12–14 দিনের বার্ষিক ছুটি দেওয়া হয়।
  • ফ্লাইট টিকিট: কিছু ফ্যাক্টরি চুক্তি শেষে ফ্লাইট টিকিট দেয়।

এছাড়া, কিছু বড় ফ্যাক্টরিতে ঈদ বোনাস, পারফরম্যান্স বোনাস বা অ্যাটেনডেন্স বোনাস ও দেওয়া হয়।

খরচ

যদিও বেতন ভালো, তবুও কিছু খরচ আপনার উপর থাকতে পারে:

  • ইউটিলিটি বিল: বিদ্যুৎ, পানি বিলের অংশ কাটা হতে পারে (মাসিক 50–100 MYR)।
  • ফোন বিল: মোবাইল রিচার্জ নিজে দিতে হয়।
  • খাবারের অতিরিক্ত খরচ: যদি বাইরের খাবার খান, তাহলে খরচ বাড়বে।
  • ভিসা রিনিউয়েল ফি: কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিককে ভিসা রিনিউয়েলের কিছু অংশ বহন করতে হয়।

গড়ে, একজন শ্রমিক মাসে 10,000–15,000 টাকা খরচ করেন—ফলে নেট সঞ্চয় হয় 35,000 থেকে 60,000 টাকা।

আবেদন প্রক্রিয়া ও খরচ

মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরি ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রথমে আপনাকে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং
এজেন্ট এর মাধ্যমে চাকরির অফার পেতে হবে। এরপর BMET-এ রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। মালয়েশিয়া পক্ষ থেকে Employment Pass অনুমোদন পাওয়ার পর আপনার পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প হবে।প্রয়োজনীয় খরচ:

  • BMET রেজিস্ট্রেশন: 10,000 টাকা
  • পাসপোর্ট: 5,000–7,000 টাকা
  • মেডিকেল টেস্ট: 3,000–5,000 টাকা
  • এজেন্ট ফি: 50,000–1,20,000 টাকা (আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু প্রচলিত)
  • ফ্লাইট টিকিট: 40,000–60,000 টাকা (কাফিল দিতে পারেন)

মোট প্রাথমিক খরচ হতে পারে 1 লাখ থেকে 2 লাখ টাকা। কিন্তু মাসিক আয়ের তুলনায় এটি 2–4 মাসের মধ্যে কভার হয়ে যায়।

  রোমানিয়া ভিসা করুন ফ্লাইওয়ে ট্রাভেলে

সতর্কতা ও পরামর্শ

অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর জানতে পারেন যে তাদের বেতন কম, কাজের পরিবেশ খারাপ, বা আবাসন অপর্যাপ্ত। এই ঝুঁকি এড়াতে:

  • সবসময় BMET-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্ট ব্যবহার করুন।
  • চাকরির অফার লেটারে বেতন, কাজের সময়, আবাসন ও খাবারের বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
  • “ফ্রি ভিসা” বা “ভিসা ছাড়া কাজ” এর প্রস্তাব গ্রহণ করবেন না।
  • মালয়েশিয়ায় পৌঁছে Passport ও Work Permit সর্বদা সঙ্গে রাখুন।

উপসংহার

মালয়েশিয়ার ফ্যাক্টরি ভিসায় বেতন গড়ে 45,000 থেকে 75,000 টাকা—যা বাংলাদেশের তুলনায় ভালো। সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা এবং
আইনগত সুরক্ষা মালয়েশিয়াকে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে। কিন্তু সফলতা আসে শুধু তখনই, যখন আপনি সঠিক তথ্য, আইনগত পথ এবং সতর্কতা নিয়ে এগিয়ে যান।